নেপাল জ্বলছিল। গত সোম ও মঙ্গলবার দেশটির রাজধানী কাঠমান্ডু এবং অন্যান্য কয়েকটি স্থানে যে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে, নেপালের ইতিহাসে তা ছিল অভাবনীয়। শুরু হয়েছিল একটি শান্তিপূর্ণ জেন জি বা নতুন প্রজন্মের প্রতিবাদ দিয়ে। কিন্তু পরে তা মোড় নেয় ভয়ানক সহিংস ঘটনায়। বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে অন্তত ২২ তরুণ প্রাণ অকালে ঝরে গেল। বিক্ষোভে নেপালের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী এবং বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর বাড়িতে আগুন দেওয়া হলো। প্রাণ হারালেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী। জনরোষের মুখে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি পদত্যাগ করলেন। কাঠমান্ডু থেকে স্থানীয় দৈনিক কান্তিপুর ডেইলির একজন সহকারী সম্পাদক খবরের কাগজে পাঠানো এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, এ রকম ভয়াবহ ঘটনা তিনি আগে কখনো দেখেননি।
ঘটনার সূত্রপাত সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে। এতে তরুণরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তবে শুধু এ কারণে নয়, তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন দুর্নীতি, বেকারত্বসহ নানা বিষয় নিয়ে। সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়লে বড় বড় শহরে কারফিউ জারি করা হয়। কিন্তু জেন জি বা নতুন প্রজন্মের সঙ্গে মধ্যবয়সী মানুষেরা কারফিউ অগ্রাহ্য করে রাস্তায় নেমে আসেন। পুলিশ পোস্টে আগুন লাগনো হয়। পুলিশ সদস্যরা জীবন বাঁচাতে পালিয়ে যান। এরপর ভয়ংকর খবর আসে বিক্ষোভকারীরা যখন রাজনীতিবিদদের বাড়িতে আগুন দেয়।
প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীদের সরকারি বাসভবন ও তাদের বাড়িগুলো পুড়িয়ে ফেলে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী, মেয়র ও অন্য নেতাদের বাড়িও শিকার হয় এই ধ্বংসযজ্ঞের। শুধু বাড়িঘর নয়, রাজনৈতিক দপ্তরগুলোতেও হামলা হয়। শাসক দল ইউএমএল (ইউনাইটেড মার্ক্সবাদী লেনিনবাদী পার্টি), নেপালি কংগ্রেস এবং মাওবাদী কেন্দ্রের অফিসেও আগুন দেয় জনতা। আগুনে পুড়ে সাবেক একজন প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী মারা যান। বিক্ষোভকারীরা দেশটির বড় বড় রাষ্ট্রীয় দপ্তরে হামলা চালান। এর মধ্যে রয়েছে সিংহদরবার (সচিবালয়), সংসদ ভবন, এমনকি প্রেসিডেন্টের কার্যালয় শীতল নিবাসেও আগুন দেওয়া হয়। সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারে পদত্যাগী প্রধানমন্ত্রী এবং অন্য মন্ত্রীদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়।
এই হামলার হাত থেকে কী সরকারি, কী বিরোধী, কোনো দলই রেহাই পায়নি। বর্তমান শাসক এবং অতীতে যারা শাসনক্ষমতায় ছিলেন, সবার বিরুদ্ধেই ক্ষোভ এবং সহিংস আন্দোলন করেছেন তরুণ ও মধ্যবয়সীরা।
এই অসন্তোষ নেপাল ছাড়িয়ে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। নেপালি তরুণদের অসন্তোষের একটা বড় কারণ দুর্নীতি। নেপালে অনেক দিন ধরেই দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি সংকুচিত হয়ে আছে। অথচ এর বিপরীতে রাজনীতিকদের সন্তানরা যেভাবে বিলাসী জীবনযাপন করছেন- যাদের বলা হচ্ছে ‘নেপো কিড’- তাদের চোখের সামনে দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছেন সাধারণ নেপালিরা।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেও খর্ব করছিল নেপাল সরকার। একদিকে সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর নির্ভর করে নিম্নবিত্তের যেসব তরুণ ব্যবসা করছিলেন, আরেক দিকে উচ্চবিত্তের যারা সাইবার সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছিলেন, এই দুই শ্রেণিই সরকারের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়েছে। আগুনে ঘৃতাহুতির কাজ করেছে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ।
একটা কথা স্পষ্ট। সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও নেপালে যা ঘটল, তাতে তরুণসমাজ যে দুর্নীতিকে মেনে নিতে চাইছে না, বেকারত্বের বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার; এরই বিস্ফোরক প্রকাশ ঘটল। যেকোনো আন্দোলন, যখন তা সহিংস হয়ে ওঠে, প্রাণহানি আর জাতীয় সম্পদের ক্ষতিসাধন করে; তখন বিবেচক জনগোষ্ঠী তা মেনে নিতে পারে না। নেপালেও দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো যাতে ধ্বংস না হয়ে যায়, সেখানকার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সে দেশের জনগণের কাছে সেই আবেদন জানিয়েছেন। আমরাও এর সঙ্গে সহমত প্রকাশ করছি। অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও প্রাণহানি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। সেই সঙ্গে দেশের সম্পদহানিও সমস্যা সমাধানের পথ হতে পারে না। নেপালে এই সহিংস ঘটনার মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা হোটেলে আটকা পড়েছেন। তাদের দ্রুত দেশটি থেকে বের করে এনে স্বদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ ও নেপাল সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি। কাঠমান্ডুর বাংলাদেশ দূতাবাস এ ব্যাপারে সর্বাত্মকভাবে সক্রিয় হবে বলে আমরা আশা করছি।
যেকোনো সহিংস ঘটনার হৃদয়বিদারক দিক থাকে। আমরা নেপালে যে প্রাণহানি ঘটেছে, সে জন্য সমবেদনা ও দুঃখ প্রকাশ করছি। সেই সঙ্গে আহ্বান জানাচ্ছি সে দেশের সাধারণ মানুষ, তরুণসমাজ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবাইকে শান্ত থেকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজতে। নেপাল এখন সন্ধিক্ষণে রয়েছে। খুব দ্রুত ক্ষমতার পালাবদল ঘটবে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। আমরা মনে করি, এখনই বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সংলাপের উপযুক্ত সময়। জীবন ও সম্পদহানি নয়, দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসুক, হিমালয়-দুহিতা নেপালের জন্য এই
আমাদের প্রার্থনা।