মানবসভ্যতার উদ্ভব ও বিকাশের পেছনে নদ-নদীর অবদান সবচেয়ে বেশি। পৃথিবীর অধিকাংশ সভ্যতাই গড়ে উঠেছে নদী-পার্শ্ববর্তী অঞ্চলকে কেন্দ্র করে। মিসরের নীল নদ এবং ইউফ্রেটিস নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল সুপ্রাচীন মিসরীয় আর মেসোপটেমীয় সভ্যতা। এ উপমহাদেশে সিন্ধু নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠে হরপ্পা-মহেনজোদারো সভ্যতা। পাঁচ হাজার বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামে যে বদ্বীপ অঞ্চলটির সৃষ্টি, তার পেছনেও রয়েছে নদ-নদীর অবদান।
নদী বিশেষজ্ঞরা বলেন, ধমনির রক্ত সঞ্চালনের মধ্য দিয়ে যেমন মানুষের প্রাণ বাঁচে, শিরা-উপশিরার মতো বাংলাদেশের অসংখ্য নদী সেভাবেই এই বদ্বীপ অঞ্চলকে প্রাণময় করে রেখেছে। বাংলাদেশের মানুষের জীবন, জীবিকা, সভ্যতা, সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য সবকিছুই গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করে। চাষাবাদ, যোগাযোগ, জীববৈচিত্র্য, প্রকৃতির ভারসাম্য ইত্যাদি রক্ষায় নদীই আমাদের সহায়তা করে।
পানি শুধু প্রকৃতির অংশ নয়, পানি সম্পদ; আর এই পানির উৎস ও আধার হচ্ছে নদী। কিন্তু আজ বাংলাদেশের অধিকাংশ নদী বিলুপ্তির পথে। এই বিলুপ্তি মানুষের সৃষ্টি। আমাদের এই বদ্বীপ অঞ্চলের জনমানুষের অবিমৃশ্যকারিতার ফল।
বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে খবরের কাগজ দুই দিন ধরে এক পৃষ্ঠাজুড়ে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বিপন্ন নদীর সংবাদ প্রকাশ করে। গতকাল আরও কয়েকটি নদীর ওপর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। গতকাল যেসব নদীর বিপন্নতার কথা আমাদের প্রতিনিধিরা পাঠিয়েছেন, সেগুলোর মধ্যে আছে যশোরের ভৈরব ও কপোতাক্ষ, মানিকগঞ্জের ইছামতী, কুষ্টিয়ার গড়াই, মাগুরার নবগঙ্গা, গাজীপুরের তুরাগ এবং দিনাজপুরের পুনর্ভবা। বাংলাদেশ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তালিকা অনুসারে বাংলাদেশের নদ-নদীর সংখ্যা ১ হাজার ৪১৫। সংখ্যা যা-ই হোক, আমরা যে চিত্র পাচ্ছি তা ভয়াবহ। প্রায় সব নদীর বিপন্ন হয়ে পড়ার কারণ অভিন্ন।
এ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে নদীতে বাঁধ দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধা দেওয়া, কলকারখানার আবর্জনা ও বর্জ্য ফেলে ভরাট করা, নদী দখল করে এর উভয় পাশে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, পলি জমে নাব্য হারানো, নদীর প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ধ্বংস করা ইত্যাদি।
বিপন্ন এসব নদ-নদীর অভিঘাতে বাংলাদেশের জনজীবন, প্রকৃতি, পরিবেশ, জীবিকা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। নদী বিলুপ্ত হলে শুধু জীবন নয়, সভ্যতার বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়। শিল্প-সংস্কৃতি, সাহিত্যের বিনাশ ঘটে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে নদী বিপন্ন এবং বিলুপ্ত হয়ে গেলে সমগ্র জনগোষ্ঠীর বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে।
আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে বাংলাদেশের নদীগুলোকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের কমতি নেই। কয়েক দশক ধরে আমরা নানা উদ্যোগের কথা শুনে আসছি। কিন্তু কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি, বরং দিন দিন পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর থেকেই তা বোঝা যায়। ‘যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ’ বলে বাংলায় প্রচলিত একটা প্রবাদ আছে। তারই সূত্র ধরে বলতে চাই, নদী রক্ষার জন্য সর্বাত্মক ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি এবং তা এখনই।
সরকারের এ ব্যাপারে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। জরুরি ভিত্তিতে যা করা প্রয়োজন, তা হচ্ছে দখল-দূষণ বন্ধ করতে হবে। নদীর প্রাণ হচ্ছে নাব্য, নাব্য রক্ষার জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার।
সার্বিকভাবে নদী রক্ষার জন্য যা যা প্রয়োজন, তার সবকিছু সরকার করবে বলে আমরা আশা করি। যেহেতু এই সংকটটি মানবসৃষ্ট, তাই আইনের কঠোর প্রয়োগ ঘটলে আমরা আমাদের নদ-নদীকে রক্ষা করতে পারব। নদীকে কেন্দ্র করে যারা বেআইনি কাজ করেন, তাদের অনতিবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
নদীর ব্যাপারে কোনো ছাড় নয়। ধমনি রুদ্ধ হয়ে গেলে মানুষ যেমন বাঁচে না, নদী শুকিয়ে গেলে বা বিলুপ্ত হয়ে গেলে বাংলাদেশের আয়ুও কমে যাবে। এর ফল হবে সুদূরপ্রসারী। এ বছরের নদী দিবসের প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমরা বলতে চাই, সুস্থ নদী, সুস্থ পৃথিবীর স্বার্থে আমাদের নদী বাঁচান, মানুষ বাঁচান।