সাবেক সরকারের সুবিধাভোগী অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কর আদায়ে বিপাকে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অন্তত ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব পাওনা রয়েছে বলে জানা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে এনবিআর রাজস্ব আদায়ের জন্য সহজ পথ খোঁজার চেষ্টা করছে। সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকও হয়েছে। অনেক করদাতা আত্মগোপনে আছেন, কেউ কেউ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। করদাতাদের অনেকের ব্যাংক হিসাব ও সম্পদ জব্দ থাকার কারণে তারা রিটার্ন জমা দিতে পারছেন না। অনেকে রিটার্ন জমার সময় বাড়ানোর আবেদন করেছেন। আত্মগোপনে থাকায় অনেকের খোঁজও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তাদের কর আদায়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে এনবিআরকে। অনেক করদাতা এতদিন কর আইনজীবীর মাধ্যমে নিজের, পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের রিটার্ন জমা দিয়ে আসছিলেন। তাদের কাছে ওইসব করদাতা নিজের পরিবার ও তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের যাবতীয় আয়-ব্যয়-মুনাফা-সম্পদসহ বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ গচ্ছিত রেখেছেন। এ ছাড়া অনেক আইনজীবীর নামে মামলা হওয়ায় তারা আত্মগোপনে আছেন। তাদের খোঁজ না থাকায় করদাতা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের রিটার্নের যাবতীয় তথ্য নতুন আইনজীবীদের কাছে ঠিকমতো সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। কর আইনজীবীদের কাছে করের ফাইল আটকে থাকায় অধিকাংশ করদাতা কর দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারছেন না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে। এনবিআর, সিআইডি, দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্র্যারিফ কমিশনের সমন্বয়ে গঠিত টাস্কফোর্স কমিটি তদন্ত শেষে বড় অঙ্কের কর খেলাপির প্রমাণ পাওয়ায় এসব ব্যক্তির হিসাব জব্দ করেছে।
সূত্র মতে, বিগত সরকারের কর খেলাপিদের মধ্যে আছেন সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, এমপি, নেতা-কর্মী, আমলা, ব্যবসায়ী, পুলিশসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। জব্দ ব্যাংক হিসাব ২ হাজারেরও বেশি। এসব জব্দ ব্যাংক হিসাব খুলে দিয়ে পাওনা আদায়ে পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে। সম্প্রতি সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড সদস্য ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, ঢালাওভাবে ব্যবসায়ীদের ব্যাংক হিসাব জব্দ রাখা ঠিক নয়। কোনো বড় ধরনের বিচ্যুতি না থাকলে জব্দ করা হিসাবগুলো খুলে দেওয়া যায়। তা না হলে সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের ওপর বিরাট প্রভাব পড়বে। অনেকে কর বা বিভিন্ন ধরনের দেনা পরিশোধ করতে পারছেন না। এক্ষেত্রে সরকারকে এসব সমস্যার সমাধানে নতুনভাবে ভাবতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, প্রভাবশালী করদাতারা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে কৌশলে পাওনা পরিশোধ করেন না। বিগত সরকারের সময়ের প্রভাবশালীদের অনেকে এর মধ্যে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, অনেকে আত্মগোপনে আছেন। আর যারা দেশে আছেন তারা বিভিন্ন আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে কর না দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ বা সম্পত্তি নিলামের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হলেও আইনের ফাঁক এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এদের কাছ থেকে কর আদায় করা কঠিন হয়ে পড়বে। পাওনা আদায় এনবিআরকে আরও কৌশলী হতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গতিশীলতা আনয়নে চেষ্টা করছে। কর ফাঁকি রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯ হাজার করদাতার মধ্যে ১৭ হাজার করদাতায় তাদের ফ্ল্যাট, প্লট, গাড়ি ও একাধিক ব্যাংক হিসাবের তথ্য গোপন করেছেন। এছাড়া অনেকের ব্যাংক হিসাব জব্দ থাকায় রিটার্ন জমা বা কর দিতে পারছেন না। এক্ষেত্রে এনবিআর বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে পাওনা টাকা আদায় করতে পারে। ঢালাওভাবে ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমতে পারে। সে কারণে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। সাবেক রাঘববোয়ালদের কাছ থেকে কর আদায়ের ক্ষেত্রে সরকার আরও কৌশলী হবে সেটিই প্রত্যাশা।