গাজায় ইসরায়েলের অবরোধের কারণে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৬৬ শিশু অপুষ্টিতে মারা গেছে।
গাজার সরকার পরিচালিত গণমাধ্যম দপ্তরের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সেখানে খাদ্য, ওষুধ এবং শিশুদের জন্য বিশেষ ধরনের দুধের ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে। হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন শতাধিক শিশু অপুষ্টিজনিত চিকিৎসার জন্য ভর্তি হচ্ছে। এটি মানবিক সংকটের মাত্রা নির্দেশ করে। অর্থাৎ অবরোধের কারণে গাজার মানুষ এক গভীর মানবিক বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ অবরোধ তুলে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে, যাতে শিশুদের জীবন রক্ষা করা যায় এবং গাজার মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ হয়। গতকাল রবিবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা ও তুরস্কের আনাদোলু নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গাজার ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ওই হামলায় এখন পর্যন্ত ৫৬ হাজার ৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি মারা গেছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। সর্বশেষ গত দুই দিনে সেখানে ইসরায়েলি হামলায় আরও ৮০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন।
জানা গেছে, গাজায় অবরোধের কারণে মানুষের কাছে খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পৌঁছানো খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার তাদের শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে অপুষ্টিজনিত ও অন্যান্য রোগ বেড়েই চলছে।
এ সপ্তাহেই তিনটি ছোট বাচ্চা অপুষ্টি ও ওষুধের অভাবে মারা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে মাত্র তিন মাস বয়সী জুরি আল-মাসরি। সে বিশেষ পুষ্টিকর দুধ খেতে না পেরে মারা গেছে। এ ছাড়া পাঁচ মাস বয়সী নিদাল শরাব এবং মাত্র ১০ দিন বয়সী কিন্ডা আল-হামসও ওষুধ ও খাবারের অভাবে মারা গেছে।
গাজার সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনাকে ‘জীবন বাঁচাতে প্রয়োজনীয় সাহায্য বাধাগ্রস্ত করার যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং বলেছে, এই অবরোধ মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল। তাদের মতে, ‘গাজা উপত্যকায় শিশুদের ওপর চলমান এই অপরাধ এবং তাদের দুর্ভোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের লজ্জাজনক নীরবতা গভীর উদ্বেগজনক।’
এই বিপর্যয়ের জন্য সংবাদমাধ্যমগুলো ইসরায়েল এবং এর মিত্র দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির ওপর দায় চাপায় এবং জাতিসংঘকে অবিলম্বে গাজার প্রবেশপথ খুলে দেওয়ার আহ্বান জানায়।
এর আগে জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফ সতর্ক করেছিল, গাজায় অপুষ্ট শিশুদের সংখ্যা ভয়াবহ গতিতে বাড়ছে। সংস্থাটি জানায়, কেবল গত মে মাসেই ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী অন্তত ৫ হাজার ১১৯ শিশুকে তীব্র অপুষ্টির জন্য চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
ইউনিসেফ জানায়, গত এপ্রিলের তুলনায় (৩ হাজার ৪৪৪ শিশু) এই সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি এবং ফেব্রুয়ারির তুলনায় (যখন একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর ছিল এবং সাহায্য প্রবেশ করছিল) প্রায় ১৫০ শতাংশ বেশি।
ইউনিসেফের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার আঞ্চলিক পরিচালক এদুয়ার বেইগবেদার বলেন, ‘এই বছরের শুরু থেকে মে মাসের শেষ পর্যন্ত ১৫০ দিনে গাজায় মোট ১৬ হাজার ৭৩৬ শিশু (প্রতিদিন গড়ে ১১২ জন) অপুষ্টিজনিত কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। অপুষ্টিজনিত প্রতিটি মৃত্যুই এড়ানো যেত, যদি প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার, পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী তাদের কাছে পৌঁছানো যেত।’ তিনি আরও বলেন, ‘মানবসৃষ্ট সিদ্ধান্তে এসব শিশু জীবন হারাচ্ছে। ইসরায়েলকে অবশ্যই জরুরিভিত্তিতে সব সীমান্ত দিয়ে জীবন রক্ষাকারী সহায়তা প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে।’
এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও জানিয়েছে, গাজার হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ১১২ শিশু অপুষ্টিজনিত চিকিৎসার জন্য ভর্তি হচ্ছে। এটি সংকটের মাত্রাকেই নির্দেশ করে বলে সংস্থাটি জানায়।
ইসরায়েল ২০২৪ সালের মার্চ থেকে গাজার প্রধান সীমান্ত পয়েন্টগুলো প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে এবং সেখানে প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। জাতিসংঘ বলেছে, গাজার মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন অন্তত ৫০০ ট্রাক সাহায্য পাঠানো দরকার। কিন্তু সাধারণত ৫০টিরও কম ট্রাক ঢুকতে পারে।
আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (আইসিসি) ইতোমধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু করেছে। এ ছাড়া ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা আন্তর্জাতিক আদালতেও চলছে।
গাজার মানুষরা এই কঠিন পরিস্থিতিতে মানবিক সাহায্যের জন্য আকুল আবেদন জানাচ্ছেন, কিন্তু অবরোধ ও সীমান্ত বন্ধ থাকার কারণে ত্রাণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আল-জাজিরার সাংবাদিক হানি মাহমুদ জানান, ‘যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সহায়তা কার্যক্রম এখন গাজায় একমাত্র খাদ্য সরবরাহকারী হিসেবে টিকে আছে, কারণ ইসরায়েল অন্য কোনো সংস্থাকে সরবরাহের সুযোগ দিচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবে অনেকেই এখন ওই সহায়তা কার্যক্রমের কেন্দ্রগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন। কারণ সেখানে যাওয়া মানেই গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি। কিন্তু তবুও তারা যেতে বাধ্য, কারণ খাবার না থাকলে শিশুদের ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যেতে হবে।’