প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দুই সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে জেল-জরিমানার রায় দিয়েছেন আদালত। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আবদুল্লাহ আল মামুন এ রায় ঘোষণা করেন।
মামলা তিনটিতে শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুলসহ মোট আসামি ২২ জন। তাদের ২১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া অপর একজন বেকসুর খালাস পেয়েছেন।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নতুন শহর প্রকল্প পূর্বাচলের প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির পৃথক তিন মামলায় এই রায় দেন আদালত। রায়ে শেখ হাসিনাকে ৭ বছর করে তিন মামলায় মোট ২১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া প্রতিটি মামলায় ১ লাখ টাকা করে মোট ৩ লাখ টাকার অর্থদণ্ড করা হয়েছে। অনাদায়ে আরও ৬ মাস করে মোট ১৮ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ওই তিন মামলার একটিতে সজীব ওয়াজেদ জয়কে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আরেক মামলায় সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায়ে তাকে ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলা তিনটির মধ্যে একটিতে শেখ হাসিনাসহ আসামি ১২ জন। আরেকটিতে শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়সহ আসামি ১৭ জন। আর অন্যটিতে শেখ হাসিনা, সায়মা ওয়াজেদ পুতুলসহ আসামি ১৮ জন।
শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ছাড়া অন্য আসামির মধ্যে একজন তিন মামলাতেই বেকসুর খালাস পেয়েছেন। তার নাম মো. সাইফুল ইসলাম সরকার। তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়।
প্লট বরাদ্দের দুর্নীতির অভিযোগে গত জানুয়ারিতে পৃথক ছয়টি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব মামলায় শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা, রেহানার মেয়ে ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক, ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক, মেয়ে আজমিনা সিদ্দিকসহ অন্যদের আসামি করা হয়। এই ছয় মামলার মধ্যে গতকাল তিনটির রায় হলো।
আসামিদের মধ্যে একমাত্র গ্রেপ্তার আছেন রাজউকের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। এই তিন মামলায় তাকে এক বছর করে মোট তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তিন মামলায় ৫ হাজার করে মোট ১৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অনাদায়ে এক মাস করে মোট তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায় ঘোষণার আগে গতকাল তাকে আদালতে হাজির করা হয়। তার উপস্থিতিতে রায় ঘোষণা শেষে তাকে আবার কারাগারে পাঠানো হয়।
এই তিন মামলায় সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদকে ৬ বছর করে মোট ১৮ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাকে ১ লাখ টাকা করে মোট ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ছয় মাস করে ১৮ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এই তিন মামলায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকারকে ছয় বছর করে মোট ১৮ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১ লাখ টাকা করে মোট ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ছয় মাস করে ১৮ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রায়ে মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) কাজী ওয়াছি উদ্দিনকে তিন মামলায় ৬ বছর করে মোট ১৮ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১ লাখ টাকা করে মোট ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ছয় মাস করে ১৮ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
একই মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদারকে রায়ে তিন মামলায় এক বছর করে মোট তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৫, ১০ ও ৫ হাজার টাকা করে মোট ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অনাদায়ে এক মাস করে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞাকে রায়ে তিন মামলায় ৫ বছর করে মোট ১৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ৫০ হাজার টাকা করে মোট দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে, অনাদায়ে তিন মাস করে ৯ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটির সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ নাসির উদ্দীনকে এই তিন মামলায় তিন বছর করে মোট ৯ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ২০ হাজার টাকা করে মোট ৬০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে, অনাদায়ে দুই মাস করে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটির আরেক সাবেক সদস্য (উন্নয়ন) মেজর (অব.) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরীকে তিন মামলায় তিন বছর করে মোট ৯ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা করে মোট ৬০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অনাদায়ে দুই মাস করে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাজউকের আরেক সদস্য (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) তন্ময় দাসকে দুই মামলায় তিন বছর করে মোট ছয় বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা করে মোট ৪০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অনাদায়ে দুই মাস করে চার মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সংস্থার আরেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মো. নুরুল ইসলামকে দুই মামলায় তিন বছর করে মোট ছয় বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ২০ হাজার টাকা করে মোট ৪০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে রায়ে, অনাদায়ে দুই মাস করে চার মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটির সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) কবির আল আসাদকে এক মামলায় তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে দুই মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাজউকের পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) শেখ শাহিনুল ইসলামকে এক মামলায় তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে দুই মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটির আরেক পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) মো. কামরুল ইসলামকে এক মামলায় তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে দুই মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) মো. হাফিজুর রহমানকে রায়ে এক মামলায় এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সংস্থার সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) মো. হাবিবুর রহমান সবুজকে এক মামলায় এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাজউকের সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) নায়েব আলী শরীফকে দুই মামলায় এক বছর করে মোট দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ৫ হাজার টাকা করে মোট ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে এক মাস করে দুই মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটির সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) মাজহারুল ইসলামকে এক মামলায় এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া রায়ে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক একান্ত সচিব মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিনকে দুই মামলায় ৬ বছর করে মোট ১২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ১ লাখ টাকা করে মোট ২ লাখ টাকার অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে, অনাদায়ে ছয় মাস করে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, এই মামলায় গত রবিবার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সম্পন্ন হয়। পরে আদালত রায় ঘোষণার তারিখ বৃহস্পতিবার (গতকাল) ধার্য করেন। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল রায় ঘোষণা করেন আদালত। আদালতে দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মইনুল হাসান।
এর আগে গত ১৭ নভেম্বর পৃথক এই তিন মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়। এর আগে গত ৩১ জুলাই আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন বিচারিক আদালত।