বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ফের বৈঠকে বসছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শনিবারের (৩১ আগস্ট) বৈঠকে মূলত সেসব দলের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যারা এর আগে আমন্ত্রিত ছিলেন না।
জানা গেছে, এবারের মতবিনিময় সভায় জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে ওলামার শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকবেন। সেখানে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, রাষ্ট্র সংস্কার এবং আগামী নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হবে। আলোচনার পর আগামী দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচন ইস্যুতে একটি রোডম্যাপ জনগণের সামনে পেশ করতে পারেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এর আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচন আয়োজনের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোতে চায় সরকার। বিশেষ করে বিএনপির সঙ্গে বৈঠকের পর অন্য দলগুলোর মতামতের আলোকে কতদিন পর নির্বাচন হতে পারে, সে বিষয়ে একটি ধারণা স্পষ্ট হতে পারে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলো কতদিন সময় দিতে চায় বা সরকার কতদিন সময় নিতে চায়, সেটি জানা যেতে পারে। তবে আগের বৈঠকের মতো এই বৈঠকেও আওয়ামী লীগসহ তাদের জোটের কোনো দল থাকবে না বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে আমাকে ফোন করা হয়েছিল। কিন্তু কী বিষয়ে কথা হবে বা বৈঠকের এজেন্ডা কী, তা জানি না। আমি ইতোমধ্যে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী, মাশরুর মাওলা, মনিরুল ইসলাম মিলনের নাম পাঠিয়েছি প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে। এখন সেখান থেকে আমাদের কতজনকে অনুমোদন দেবে, তা জানি না। তবে কাল (শনিবার) আমরা যাব।’
শনিবার প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনায় বেলা ৩টায় বৈঠক শুরু হয়ে চলবে রাত ৮টা পর্যন্ত। ফলে দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে দ্বিতীয়বারের মতো মতবিনিময় করতে যাচ্ছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার। টানা ৫ ঘণ্টা বৈঠক হবে।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের মতবিনিময়ের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে আলোচনার মূল বিষয় থাকবে প্রয়োজনীয় সংস্কার। কারণ বিগত সরকার প্রতিটি সেক্টর ধ্বংস করে রেখে গেছে। বিশেষ করে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করা জরুরি। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটা শিক্ষা কমিশন গঠন করতে হবে, যেখানে আলেম-ওলামার মতামত নিতে হবে। দেশে সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট ও দেশের টাকা পাচারকারীদের বিচারের আওতায় আনার কথা তুলে ধরব।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কবে হবে এটা নিয়ে তাড়াহুড়ো নেই আমাদের। কারণ আগে দরকার সংস্কার। তবে বেশি সময় নিলে নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে, সেটাও খেয়াল রাখার কথা বলব। আর নির্বাচন হতে হবে আনুপাতিক হারে, যেখানে কোনো ব্যক্তিকে নয় বরং দল ও প্রতীকে ভোটের ব্যবস্থা থাকা। প্রহসনের নির্বাচনের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের বাদ দিয়ে নতুন কমিশন গঠন করতে হবে।’
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মনজুরুল ইসলাম আফেন্দি বলেন, ‘রাষ্ট্র সংস্কার বলতে যা বোঝায় সে বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করব। নির্বাচনের রোডম্যাপ, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও তাদের ধর্মীয় উপাসনালয় রক্ষায় গুরুত্ব দেব। তবে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা আমরা দেব না।’
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর গত ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের বৈঠক হয়। এদিন তার সঙ্গে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা সাক্ষাৎ করেন।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ‘যমুনা’য় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের তিন সিনিয়র নেতা। পরে মির্জা ফখরুল বলেন, প্রায় সোয়া ১ ঘণ্টা আলোচনা হয়েছে। অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। নির্বাচনের কোনো সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো তারিখ নিয়ে আলোচনা করিনি। আমরা কোনো তারিখ বলব না।’
অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, বৈঠকে বিএনপির নেতারা মূলত বর্তমান সরকারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার ভাবনা, নির্বাচন নিয়ে তাদের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে আলোকপাত করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর ব্যাপারে তাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। ভবিষ্যতেও এই সমর্থন থাকবে।
বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সংস্কার এবং নির্বাচন প্রসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ব্যাপকভিত্তিক সংলাপ শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়, সে ব্যাপারে তারা অনুরোধ করেন। বিএনপির সঙ্গে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা পরই প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে শনিবারের মতবিনিময়ের সময়সূচি জানানো হয়।
গত বৃহস্পতিবার (২৯ আগস্ট) অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের এক বৈঠক শেষে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকার আলাপ-আলোচনার প্রক্রিয়া চালু রাখবে। তারা যেসব সংস্কার প্রস্তাব দেবে তা সরকার গ্রহণ করবে।
সম্প্রতি বিএনপিসহ সমমনা কয়েকটি দলের নেতারা পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার রোডম্যাপ জানতে চেয়ে বক্তব্য দিয়ে আসছেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত রবিবার জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘কখন নির্বাচন হবে সেটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, আমাদের সিদ্ধান্ত নয়। দেশবাসীকে ঠিক করতে হবে আপনারা কখন আমাদের ছেড়ে দেবেন। আমরা ছাত্রদের আহ্বানে এসেছি। তারা আমাদের প্রাথমিক নিয়োগকর্তা। দেশের আপামর জনসাধারণ আমাদের নিয়োগ সমর্থন করেছেন। আমরা ক্রমাগত সবাইকে বিষয়টি স্মরণ করিয়ে যাব, যাতে হঠাৎ করে এই প্রশ্ন উত্থাপিত না হয়- আমরা কখন যাব। তারা যখন বলবে আমরা তখনই চলে যাব।’