ইসলামের যতগুলো আনুষ্ঠানিক বিষয় আছে, তার মধ্যে নামাজই বেশি পালন করা হয়। নামাজ ব্যক্তি ও সমাজ গঠনের বড় মাধ্যম। নামাজ সবার জন্য বাধ্যতামূলক। আল্লাহ বলেন, ‘নামাজ (ব্যক্তি ও সমাজজীবনে) অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে দূরে রাখে।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫)
প্রতিদিন সারা বিশ্বে কোটি কোটি মুসলিম নামাজ পড়ছেন। আবার এই মুসলিমদের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে অন্যায় ও অশ্লীল কাজ করে যাচ্ছেন। এমতাবস্থায় স্বাভাবিক মনে প্রশ্ন জাগে—সমস্যাটা আসলে কার, নামাজ নাকি নামাজি ব্যক্তির? আসলে নামাজ ঠিকই আছে। নামাজ যে পড়ছে, তারই প্রকৃত সমস্যা।
যদি প্রশ্ন করা হয়, নামাজ পড়ার উদ্দেশ্য কী? সবাই একই জবাব দেয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। আসলে এখানেই বোঝার ঘাটতি রয়েছে অধিকাংশ মানুষের। ইসলামের প্রতিটি কাজের দুটি উদ্দেশ্য থাকে। একটি অনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য, আরেকটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য। নামাজসহ সব কাজের অনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, ‘বলো, আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু মহাবিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহর (সন্তুষ্টির) জন্য।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১৬২)
নামাজের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য হলো, ‘নিশ্চয় নামাজ (ব্যক্তি ও সমাজজীবন থেকে) অশ্লীল ও নিষিদ্ধ (অন্যায়) দূর করে।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫)
সুরা আনকাবুতের এই আয়াতের মাঝের অংশ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ও পরের অংশ যদি কেউ ভালোমতো না পড়ে, তাহলে আয়াতের মর্মার্থ বুঝতে পারবে না। আল্লাহ এখানে নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছেন, নিশ্চিতভাবে যে ব্যক্তি নামাজ আদায় করবে, সে ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে কোনো অশ্লীলতা ও অন্যায় কাজ করতে পারে না। কোরআনে ‘নামাজ’ শব্দটি মোট এসেছে ১০২ বার। এর মধ্যে ‘ধরনে’র অর্থে এসেছে ৫৫ বার। তথা নামাজ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি ‘তথ্য আকারে’ এসেছে ২৯ বার। আর নামাজ প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টি ‘আদেশ আকারে’ এসেছে ১৮ বার। ‘নামাজ কায়েম করা’ বাক্যটির মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা যা বোঝাতে চেয়েছেন, রাসুল (সা.) সেটি সঠিকভাবে সাহাবিদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান মুসলিমরা সেটা হারিয়ে নামাজের অমৌলিক বিষয় নিয়ে বিতর্কের জালে আটকে গেছে। ফলে নামাজের উদ্দেশ্য সাধিত হচ্ছে না। নামাজের উদ্দেশ্য সাধিত না হওয়ার কারণে ব্যক্তি ও সমাজে তার প্রভাব পড়ছে না।
নামাজ প্রতিষ্ঠার অর্থ হলো, নামাজে যা পড়ি, আর নামাজে যা করি—পড়া ও করা থেকে শিক্ষা নিয়ে, সে শিক্ষা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে বাস্তবায়ন করা।
নামাজ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আল্লাহতায়ালা কোরআনে বহু জায়গায় নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, ‘তুমি যে কিবলার দিকে ছিলে তাকে কিবলা নির্ধারণ করেছিলাম শুধু এটা জানার জন্য যে, কে রাসুলের অনুসরণ করে আর কে পেছনের (পূর্বাবস্থায়) দিকে ফিরে যায়।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৪৩) প্রতিদিন পাঁচবার নামাজের সময় কাবার দিকে মুখ ফেরানো, রুকু করা, সিজদা করা ইত্যাদি আদেশের পেছনে আল্লাহর উদ্দেশ্য শুধু ওই অনুষ্ঠানগুলো পালন করানো নয়। এর পেছনের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহর আদেশ পালনের মানসিকতা তৈরির শিক্ষা দেওয়া। যাতে নামাজ আদায়কারী নামাজের বাইরের প্রতিটি কাজ আল্লাহর আদেশ অনুসরণ করে পালন করে।
পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর দুর্ভোগ (ওয়াইল নামক জাহান্নাম) সেই নামাজ আদায়কারীদের জন্য, যারা তাদের নামাজ (সময়, নিষ্ঠা, একাগ্রতা ইত্যাদি) সম্পর্কে উদাসীন। যারা লোকদেখানো কাজ করে। আর পাতিলের ঢাকনি (ছোটখাটো জিনিস) মানুষকে দেওয়া থেকে বিরত থাকে।’ (সুরা মাউন, আয়াত: ৪-৬)
নামাজ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) অনেক কথা বলেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, “একবার এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রাসুলুল্লাহ! অমুক মহিলা নামাজ ও জাকাতে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। তবে সে নিজের মুখ দিয়ে তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। তিনি বললেন, ‘সে জাহান্নামি।’ লোকটি আবার বলল, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! অমুক মহিলা সম্পর্কে জনশ্রুতি আছে যে, সে কম (নফল) রোজা রাখে, কম (নফল) সদকা করে এবং নামাজও (নফল) কম পড়ে। তার দানের পরিমাণ হলো পনিরের টুকরাবিশেষ (খুবই কম)। কিন্তু সে নিজের মুখ দিয়ে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘সে জান্নাতি।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৯৬৭৩)
এই হাদিসে প্রথম মহিলা প্রচুর নামাজ আদায় করেছে, কিন্তু প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়ার কারণে তাকে জাহান্নামে যেতে হবে। আর দ্বিতীয় মহিলা কম নামাজ আদায় করেছে, কিন্তু প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেওয়ার কারণে সে জান্নাত যাবে।
প্রথম মহিলা নামাজ আদায় করেছে ঠিকই, কিন্তু সে নামাজ থেকে শিক্ষা নেয়নি। বাস্তব জীবনে নামাজের শিক্ষা প্রয়োগ করেনি। এ কারণে তাকে জাহান্নামে যেতে হবে। অন্যদিকে দ্বিতীয় মহিলা কম নামাজ পড়েও নামাজের শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগের ফলে জান্নাতের অধিবাসী হয়েছেন।
লেখক : আলেম ও গবেষক
