বর্তমান বিশ্বে স্থূলতা একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। একটি নীরব ঘাতক। এটি ধীরে ধীরে শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে প্রভাবিত করে এবং জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। স্থূলতা (Obesity) শুধু বাহ্যিক গড়নের বিষয় নয়; এটি একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগ। বিশ্বজুড়ে এটি দ্রুত বাড়ছে এবং বহু প্রাণঘাতী রোগের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং রোজা রাখার অভ্যাস জীবনযাপনে যুক্ত করা অপরিহার্য।
স্থূলতা ভয়াবহতা—World Health Organization (WHO)-এর মতে, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল ও ধমনিতে চর্বি জমার অন্যতম প্রধান কারণ স্থূলতা। Centers for Disease Control and Prevention (CDC) জানায়, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষেরই ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। শরীরে অতিরিক্ত ফ্যাট ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, ফলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে।
স্থূলতার কারণে লিভারে চর্বি জমে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ হতে পারে। দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করলে এটি লিভার সিরোসিসে রূপ নিতে পারে। একইভাবে কিডনির ওপরও বাড়তি চাপ পড়ে, যা কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
National Cancer Institute-এর তথ্যানুযায়ী, স্তন, কোলন, জরায়ু ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় স্থূলতা। অতিরিক্ত চর্বি শরীরে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে, যা কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করতে পারে। এ ছাড়া অতিরিক্ত ওজন ফুসফুসের স্বাভাবিক প্রসারণে বাধা দেয়, হাঁটু ও কোমরের জয়েন্টে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে, আত্মবিশ্বাস হ্রাস, সামাজিক সংকোচ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়ে এবং গড় আয়ু কমিয়ে দিতে পারে।
অনেকেই দ্রুত ওজন কমানোর জন্য বিভিন্ন কৃত্রিম ডায়েট বা ওষুধের আশ্রয় নেন, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। অথচ ইসলাম আমাদের একটি প্রাকৃতিক, স্বাস্থ্যকর ও হালাল পদ্ধতি দিয়েছে—রোজা। আল্লাহতায়ালা কোরআনে এরশাদ করেছেন, তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু সীমালঙ্ঘন করো না। (সুরা আরাফ, ৩১)। এই নির্দেশনা শুধু আধ্যাত্মিক নয়; এটি স্বাস্থ্যবিজ্ঞানেরও মূলনীতি। সীমিত খাদ্যগ্রহণই ওজন নিয়ন্ত্রণের প্রথম শর্ত।
রোজা যেভাবে স্থূলতা নিয়ন্ত্রণ করে—রমজানে নির্দিষ্ট সময়ে খাদ্যগ্রহণের ফলে স্বাভাবিকভাবেই অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ কমে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের Harvard T.H. Chan School of Public Health-এর পুষ্টিবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রমজানে সময়সীমাবদ্ধ খাদ্যাভ্যাস (time-restricted eating) মোট ক্যালরি গ্রহণ কমাতে সহায়ক, যা ওজন কমানোর একটি কার্যকর উপায়।
যুক্তরাজ্যের University of Oxford-এর কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়ন্ত্রিত উপবাস বা রোজা শরীরের বিপাকীয় নমনীয়তা (metabolic flexibility) বাড়ায়। অর্থাৎ শরীর কার্বোহাইড্রেটের বদলে চর্বি পোড়াতে বেশি সক্ষম হয়।
গবেষক Susan A. Jebb উল্লেখ করেন, খাদ্যগ্রহণে নিয়মিত বিরতি দিলে শরীর জমে থাকা ফ্যাটকে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে—যা ওজন কমাতে সহায়ক।
স্থূলতার একটি বড় কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত ক্ষুধা। রোজা ক্ষুধা হরমোন ও পেট ভরার সংকেতদাতা হরমোনের ভারসাম্য পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখে।
মার্কিন পুষ্টিবিজ্ঞানী Krista Varady তার গবেষণায় (University of Illinois, ২০১৩) দেখিয়েছেন, উপবাস বা রোজা ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, শরীরের চর্বি কমায় এবং এর ফলে ওজন কমে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে পরিচালিত একটি গবেষণা (Journal of Nutrition and Metabolism)-এ দেখানো হয়েছে, রমজানে নিয়ন্ত্রিত খাদ্যগ্রহণ করলে শরীরের ওজন ও কোমরের পরিধি উভয়ই কমে। এতে বিশেষভাবে ভিসারাল ফ্যাট (পেটের ভেতরের ক্ষতিকর চর্বি) হ্রাস পায়।
রোজা শুধু ইবাদত নয়; এটি একটি স্বাস্থ্যকর ও হালাল জীবনব্যবস্থা। গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে—সঠিক নিয়মে রোজা পালন করলে ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ, হরমোনের ভারসাম্য, চর্বি হ্রাস ও মানসিক সংযম—সবকিছু একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব। অতএব, রোজাকে আমরা যদি সচেতনভাবে গ্রহণ করি, তবে এটি হবে ওজন নিয়ন্ত্রণের নিরাপদ, প্রাকৃতিক ও আল্লাহপ্রদত্ত একটি উত্তম উপায়।
বি.দ্র. রমজানের রোজা ইসলামের ফরজ বিধান। আল্লাহতায়ালার হুকুম ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত হিসেবে রোজা রাখতে হবে। জাগতিক কোনো উদ্দেশ্য বা উপকারিতার নিয়তে রোজা রাখলে তা সহিহ হবে না। তবে আল্লাহতায়ালার হুকুম ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত হিসেবে রোজা রাখলে অতিরিক্ত হিসেবে বিভিন্ন উপকারিতা অর্জন হবে, ইনশা আল্লাহ।
লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক