ঈদের দিন তিনবেলা পেট পুরে ভালোমন্দ খেতে পাওয়াই তাদের একমাত্র আনন্দ। খাওয়া-দাওয়া ছাড়া তাদের কাছে বছরের অন্য দিনের চেয়ে ঈদের দিন খুব বেশি ভিন্ন নয়। বরং ঈদের দিনটায় তারা বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়। অন্য শিশুদের নতুন জামা পরে পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তাদের অপ্রাপ্তিকে। কারণ তাদের বাবা-মা নেই, দায়িত্ব নেওয়ার কেউ নেই, নেই ভালোবাসা ও মমতা দিয়ে পরম স্নেহে কোলে তুলে কপালে চুমু দেওয়ার। তাই ঈদের চাঁদ হাসলেও হাসে না তারা।
বলছিলাম রাজধানীর আজিমপুরে অবস্থিত স্যার সলিমুল্লাহ্ মুসলিম এতিমখানায় বেড়ে ওঠা এতিম শিশু-কিশোরদের কথা। বাবা-মা হারানো পরিবার ছাড়া বেড়ে ওঠা এসব শিশুর মলিন মুখ জানান দেয় তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ, চাপাকষ্ট, হাহাকারের কথা। কিন্তু মুখে বলতে পারে না, দু-চোখ বেয়ে শুধু অশ্রু ঝরে।
বৃহস্পতিবার (২১ মার্চ) সরেজমিনে স্যার সলিমুল্লাহ্ মুসলিম এতিমখানা ঘুরে দেখা যায়, এখানে ১৫০ জন এতিম শিশু-কিশোর রয়েছে। এর মধ্যে মেয়ে শিশু ৭৬ জন ও ছেলে ৭৪ জন। এসব শিশুর দেখভাল, খাবার ও পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে তাদের ধর্মীয়, প্রাথমিক ও কারিগরি শিক্ষাও দেওয়া হয়। প্রাথমিক শিক্ষার জন্য রয়েছে নিজস্ব দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ ছাড়া মেয়েদের কম্পিউটার শিক্ষা, বিউটি পার্লার ও সেলাই মেশিনের কাজ শেখানো হয়। ছেলে শিশুদের কম্পিউটার শিক্ষা, ড্রাইভিং ও ঝালাইয়ের কাজ শেখানো হয়।
এখানকার বেশির ভাগ শিশুই রোজা রাখে। নামাজ ও কোরআন পড়ছে নিয়মিত। তাদের সাহরি ও ইফতারিসহ সব বেলার খাবার দেওয়া হয়। এ ছাড়া ঈদে দেওয়া হয় নতুন জামা। থাকে বিশেষ খাবারের আয়োজন। এখানে বেড়ে ওঠা বেশির ভাগ শিশুর বয়স ৬ থেকে ১৮ বছর। এখানে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত এতিম শিক্ষার্থীদের পড়ার খরচ চালায় এতিমখানা কর্তৃপক্ষ। এখানে মেয়েশিশুদের জন্য রয়েছে স্যার সলিমুল্লাহ্ জুনিয়ার বালিকা বিদ্যালয় ও ছেলেদের জন্য রয়েছে স্যার সলিমুল্লাহ জুনিয়ার বালক বিদ্যালয়। এই শিশুদের পাঠদানে নিয়োজিত রয়েছে ২০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা। এ ছাড়া এতিমখানায় এসব শিশু-কিশোরদের সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন ৬০ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী।
এতিম শিশুদের মধ্যে একজন চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিয়া আকতার তাজফিয়া। তাজফিয়া স্যার সলিমুল্লাহ্ জুনিয়র বালিকা বিদ্যালয়ে পড়ে। ঈদ ও বাবা-মায়ের কথা জিজ্ঞাসা করতেই তার দুই চোখ ভিজে আসে। তাসফিয়া জানায়, বাবা-মা মারা যাওয়ার পর থেকে সে ৪ বছর ধরে এখানেই বেড়ে উঠছে। সারা বছর পড়াশোনা ও সহপাঠীদের সঙ্গে ভালো সময় কাটলেও রোজা এলেই খুব মন খারাপ হয় তার। অনেকে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঈদ করতে বাড়িতে গেলেও তাকে কেউ নিতে আসে না। প্রতি বছরই সে এতিমখানায় ঈদ করে।
তাজফিয়ার আরেক সহপাঠী মরিয়ম ইসলাম। প্রথম রমজান থেকে এ পর্যন্ত সব রোজা রেখেছে সে। মরিয়ম খবরের কাগজকে বলে, ‘বাবা নেই। মায়ের আরেক জায়গায় বিয়ে হয়েছে, মা তাকে মাঝে-মধ্যে দেখতে আসে, তবে কখনো সঙ্গে নিয়ে যায় না। তার আরেক ভাইও এই এতিমখানায় বেড়ে উঠছে।
বাবার কথা জিজ্ঞাসা করতেই দু-চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। বাবা তাকে মা বলে ডাকতো, এটা তার বেশি মনে পড়ে। বলতেই আবারও অঝোরে কাঁদতে থাকে, আর কিছু বলতে পারে না।
এই এতিমখানায় বালক শাখায় স্যার সলিমুল্লাহ্ জুনিয়র বালক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু রাহাত। তার বাড়ি বরিশাল। রাহাত খবরের কাগজকে জানায়, কিডনিজনিত সমস্যার কারণে বছরখানেক আগে তার বাবা মারা গেছেন। এখন তার ঠিকানা এই এতিমখানা। বড় এক বোন আছে। মাসে দুই-এক বার দেখতে আসেন। ঈদে স্বজনেরা কেউ নিতে আসে না তাই প্রতি বছরই এতিখানায় ঈদ করে রাহাত।
বালক শাখায় আরও রয়েছে নাজমুল হোসেন ও তার ভাই রিফাত হোসেন। তিন বছর হলো তারা এই এতিমখানায় থাকছে। বাবা-মারা যাওয়ার পরে মাও তাদের তেমন খোঁজখবর নেন না। এই এতিমখানাই তাদের ঘরবাড়ি। সারা বছরের মতো ঈদেও এখানেই থাকে তারা।
এতিমখানায় তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে রয়েছেন মো. হারুন অর রশীদ। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, বাবা-মা নেই, বা আইনগত কোনো অভিভাবক নেই এমন শিশুরাই আমাদের এখানে বেড়ে উঠছে। এ শিশুদের আমরা খাবার, পোশাক থেকে শুরু করে প্রাথমিক, ধর্মীয় এবং কারিগরি শিক্ষাও দিয়ে থাকি।
তিনি বলেন, এখানে শৈশব থেকে বেড়ে ওঠা অনেকে এখন বিসিএস থেকে শুরু করে পুলিশ, সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে। অনেকে দেশের বাইরে উচ্চতর ডিগ্রি নিচ্ছে।
এতিমখানায় শিশুদের ঈদ করার বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক শিশু ছুটি হলে তাদের স্বজনদের কাছে ঈদ করতে চলে যায়। তবে অনেকে আবার এখানেই ঈদ করে। বিষয়টি আমাদেরও কষ্ট দেয়। ঈদে প্রত্যেকের জন্য নতুন পোশাক ও বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা থাকে।
তিনি আরও বলেন, বাবা-মা না থাকাটা অনেক কষ্টের, এই বয়সে তো বটেই। শিশুরা কাঁদলে তাদের কাছে নিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করি। ওদেরকে নিজের সন্তানের মতোই দেখি।