ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা শেষ পর্যন্ত এশিয়া কাপে প্রভাব ফেলেছে। গতকাল (১৪ সেপ্টেম্বর) দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত হাইভোল্টেজ ম্যাচ শেষে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের সঙ্গে হাত মেলায়নি ভারতীয় ক্রিকেটাররা। ভারতীয় অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব নিশ্চিত করেন, প্রতিবাদের অংশ হিসেবে তার দল পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত মেলানো থেকে বিরত থেকেছে।
অনেকেই আশা করেছিলেন, মাঠের খেলা হয়তো দুই দেশের রাজনৈতিক উত্তাপ কমাতে সহায়ক হবে। কিন্তু সূর্যকুমার সেই প্রত্যাশায় জল ঢেলে দিয়ে জানান, পাকিস্তানের বিপক্ষে তাদের ৭ উইকেটের জয় ছিল মে মাসে চারদিনের সীমান্ত সংঘর্ষের যথাযথ জবাব।
ম্যাচ শেষে সূর্যকুমার বলেন, ‘আমাদের সরকার এবং বিসিসিআই একই অবস্থানে ছিল এই ম্যাচ খেলতে আসা নিয়ে। আমরা এখানে শুধু ম্যাচ খেলতে এসেছিলাম এবং পাকিস্তানকে নিখুঁত জবাব দিয়েছি।’
ম্যাচ শেষে কী ঘটেছিল?
মহারণে উইনিং রান করেন সূর্যকুমার। তখন তার সঙ্গী ছিলেন শিভম দুবে। খেলা শেষে করে প্রথা মেনে তারা পাকিস্তানের অধিনায়ক ও দলের সঙ্গে প্রথাগতভাবে হাত মেলাতে যাননি। পাকিস্তানের খেলোয়াড়রা একত্রে দাঁড়িয়ে ভারতের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটাররা ও সাপোর্ট স্টাফরা কেবল নিজেদের মধ্যে হাত মিলিয়ে সরাসরি ড্রেসিংরুমে চলে যান এবং দরজা বন্ধ করে দেন।
কেন ভারতীয় দল হাত মেলালো না?
ভারতীয় অধিনায়ককে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, তাদের এই আচরণ কি খেলার চেতনার পরিপন্থী নয়, তিনি উত্তর দেন, ‘জীবনে কিছু বিষয় থাকে যা খেলোয়াড়সুলভ চেতনার চেয়েও বড়। আমরা পেহেলগাম সন্ত্রাসী হামলার সব ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের পাশে আছি। এই জয় আমরা উৎসর্গ করছি অপারেশন সিঁদুরে অংশ নেওয়া আমাদের সাহসী সেনাদের।’
ভারত কি কোনো নিয়ম ভেঙেছে?
শুরু থেকেই ম্যাচটি ছিল অতি উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশে। এমনকি টসের আগে দুই অধিনায়ক হাত মেলাননি। পরে জানা যায়, ম্যাচ রেফারি অ্যান্ডি পাইক্রফটই উভয় অধিনায়ককে এভাবে করতে অনুরোধ করেছিলেন। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) এক কর্মকর্তা আল জাজিরাকে জানান, ‘ম্যাচ রেফারি উভয় অধিনায়ককে টসে হাত না মেলাতে অনুরোধ করেছিলেন।’
সূত্র মতে, ম্যাচ কর্মকর্তারা ভারতীয় দলকে ম্যাচ-পরবর্তী হাত মেলানো থেকেও অব্যাহতি দেন, তবে পাকিস্তানের অধিনায়ক সালমান আলি আঘা বা দলের কাউকে তা জানাননি। ফলে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়- পাকিস্তানের খেলোয়াড়রা অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকেন, আর ভারতীয়রা সরাসরি ড্রেসিংরুমে চলে যান ও দরজা বন্ধ করে দেন।
ক্রিকেটে হাত মেলানো কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রোটোকল কী?
ক্রিকেটের নিয়ম অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করা দলের দুই ব্যাটসম্যান ম্যাচ শেষে মাঠ ছাড়ার আগে ফিল্ডিং করা দলের খেলোয়াড় এবং আম্পায়ারদের সঙ্গে হাত মেলান। এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাটিং করা দলের বাকি খেলোয়াড়রাও মাঠে প্রবেশ করে প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাত মেলান।
এটি উভয় দলের জন্য ম্যাচ শেষ করার একটি বন্ধুসুলভ রীতি, যেখানে খেলোয়াড়রা একে অপরকে উৎসাহ বা অভিনন্দনের কিছু কথা বলতে পারেন। একইভাবে, ম্যাচ শুরুর ৩০ মিনিট আগে টসের সময় দুই অধিনায়ক করমর্দন করেন।
ঘটনাটি নিয়ে টুর্নামেন্ট কর্মকর্তারা কী বলেছেন?
এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) চেয়ারম্যান এবং পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) চেয়ারম্যান মোহসিন নকভি বিষয়টি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্টে লিখেছেন, ‘আজকে (রবিবার) ক্রীড়াসুলভ আচরণের অভাব দেখে ভীষণ হতাশ হয়েছি। খেলায় রাজনীতি টেনে আনা খেলাধুলার চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত।’
পাকিস্তানের প্রতিবাদ
পাকিস্তানের টিম ম্যানেজার নাভিদ আকরাম চীমা বিষয়টি আইসিসি স্বীকৃত ম্যাচ রেফারি অ্যান্ডি পাইক্রফটের কাছে তুলে ধরেন। পিসিবির এক কর্মকর্তা জানান, আম্পায়াররা ভারতীয়দের করমর্দন না করেই মাঠ ছাড়ার অনুমতি দিয়েছিল। আমাদের টিম ম্যানেজারের প্রতিবাদের পর ম্যাচ রেফারি ক্ষমা চান।
প্রতিবাদের অংশ হিসেবে পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান আলি আঘা ম্যাচ শেষে হোস্ট সম্প্রচারকের সঙ্গে নির্ধারিত আড্ডায় উপস্থিত হননি। পাকিস্তানের প্রধান কোচ মাইক হেসন নিশ্চিত করেছেন, আঘার এই নীরবতা সরাসরি ভারতের আচরণের প্রতিক্রিয়া ছিল।
অনিক/