বয়ঃসন্ধিকালে আমাদের মানসিক পরিপক্বতা ও অভিজ্ঞতা কম থাকে। আবার এই সময় থেকে আমাদের জগৎ, কর্মকাণ্ড বিকশিত হয়। তাই জীবনের এই পর্যায়েই দেখা যায় সবচেয়ে বেশি ভুল করার প্রবণতা। তবে কৈশোরের ভুল মানেই কিন্তু চলার পথে ইতি টানা নয়। বরং ভুল থেকেই হতে পারে ইতিবাচক বেড়ে ওঠা।
কিশোর বয়সে কেন বেশি ভুল হয়
অপরিণত মস্তিষ্কের গঠন
বয়ঃসন্ধিকালে বেশির ভাগ ভুলের জন্য দায়ী করা যেতে পারে আমাদের মস্তিষ্ককে। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের থেকে কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কের গঠন অনেকটাই আলাদা। আমাদের মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ দুটি অংশ হলো অ্যামিগডালা এবং ফ্রন্টাল কর্টেক্স। ফ্রন্টাল কর্টেক্স আমাদের কোনো কাজ করার আগে যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে অ্যামিগডালা কোনো কিছুর বিপরীতে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও উত্তেজনা তৈরি করে। বয়ঃসন্ধিকালে মস্তিষ্কের বিকাশ লাভ করতে শুরু করে এ কথা তো আমরা সবাই জানি। তবে এ সময় অ্যামিগডালা যত দ্রুত বিকাশ লাভ করে ফ্রন্টাল কর্টেক্স তত দ্রুত বিকাশ লাভ করতে পারে না। কাজ বা প্রতিক্রিয়া প্রকাশের আগে যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার এই ভারসাম্যহীনতাই কিশোর বয়সে ভুল করার বড় কারণ।
হরমোনের কার্যকলাপ
বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছানোর পর হঠাৎ শরীরে নানা ধরনের হরমোনের বিকাশ ঘটে। ফলে বিভিন্ন হরমোনের কার্যকলাপ ও মাত্রাও অনেকাংশে বেড়ে যায়। কৈশোরে মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোনের মাত্রা বেশি থাকায় এ সময় যেকোনো আনন্দদায়ক কাজ, ঝুঁকিপূর্ণ অভিজ্ঞতা, নিষিদ্ধ দ্রব্যের প্রতি আগ্রহ বেশি থাকে। কৈশোরে এই আগ্রহ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হওয়ায় ক্ষতিকর কাজ কিংবা নেতিবাচক অভ্যাসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
স্বল্প অভিজ্ঞতা
শৈশবে আমাদের জীবন পরিবার-পরিজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কৈশোরে ছেলেমেয়েদের স্বাধীন চলাফেরা, বন্ধুবান্ধব, সামাজিক পরিচিতি ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার ধারণাগুলো প্রকাশ পায়। তবে শুরুর দিকে সামাজিক বিকাশের এই পথটা সহজ নয়। কৈশোরে সামাজিক অভিজ্ঞতা কম থাকায় বিপজ্জনক পরিস্থিতি, নেতিবাচক সঙ্গ, ভুল সিদ্ধান্তের শিকার হতে পারে কিশোর-কিশোরীরা।
কৈশোরের সাধারণ কিছু ভুল
আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত
কিশোর-কিশোরীরা স্বভাবতই আবেগপ্রবণ। এ বয়সে মস্তিষ্কের যৌক্তিক ক্ষমতাও কম থাকে। আবেগের বশে নিজের শারীরিক, মানসিক ক্ষতি করা, ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলের শিকার হওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিকর কাজে অংশ নেওয়া কিশোর বয়সের লক্ষণীয় ভুল।
মাদকদ্রব্যে আসক্তি
কিশোর-কিশোরীরা কৌতূহলপ্রবণ। কোনো কিছু ইতিবাচক না নেতিবাচক সেটি না ভেবেই অনেক সময় নতুন কিছুর অভিজ্ঞতা নিতে মুখিয়ে থাকে। এ বয়সে অনেকে বন্ধুদের প্ররোচনায়, মজার ছলে কিংবা কৌতূহল থেকে মাদকদ্রব্যে আসক্ত হয়ে পড়ে। এ সময় ডোপামিন হরমোনের মাত্রা বেশি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ কম থাকায় মাদকদ্রব্যের সঙ্গে অভ্যস্ততাও হয়ে যায় তাড়াতাড়ি।
নেতিবাচক সঙ্গ নির্বাচন
কৈশোরে আমরা সাধারণত অন্যদের মাধ্যমে সহজেই প্রভাবিত হই। বন্ধুদের মধ্যে নেতিবাচক আচরণ, মন্দ অভ্যাস থাকলে তার প্রভাব পড়তে পারে নিজেদের ওপর। অনেকে আবার অসৎ উদ্দেশ্যেই বন্ধুত্ব গড়ে তুলে। কৈশোরে সামাজিক অভিজ্ঞতা কম থাকায় পরিচিত ও বন্ধু নির্বাচনে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি দেখা যায়।
পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব
বয়ঃসন্ধিকালে স্বাধীনভাবে চলাফেরার ও মত প্রকাশের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। এমন অনুভূতি অমূলক নয়। তবে অনেক সময় কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে ফেলে।
ভুল করা কি খারাপ
‘ভুল’ শব্দটি বেশির ভাগ অর্থেই আমাদের কাছে নেতিবাচক শব্দ। কিশোর বয়সে মানসিক অপরিপক্বতা ও স্বল্প অভিজ্ঞতার কারণে ভুল কাজ করা কিংবা ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘটনা বেশি ঘটে। ছেলেমেয়েরা প্রায়ই আচরণগত, সিদ্ধান্তগত কিংবা কাজেকর্মে ভুল করে বসলে সেটি নেতিবাচক কি না এমন প্রশ্ন জাগে অনেকেরই। কিশোর-কিশোরীরাও নিজেদের ভুলের কারণে আত্মবিশ্বাসের অভাব ও হীনম্মন্যতায় ভুগে। তবে বয়ঃসন্ধিকালে ভুল করার অভ্যাসকে নেতিবাচক মনে করেন না সমাজ বিশ্লেষক ও অপরাধবিজ্ঞানীরা। বরং বেড়ে ওঠার এই সময়ে ভুল করা একটি স্বাভাবিক ঘটনা। অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায়, অতিরিক্ত বাঁধাধরা জীবনের কারণে অপরিণত বয়সে ভুল করার সুযোগই না পাওয়াও ভয়ের কারণ। এতে করে পরিণত বয়সে বড় ধরনের অপরাধ করার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। বড় ধরনের বিপদ এড়িয়ে চলতে কিশোর-কিশোরীদের বড়দের সংস্পর্শ ও পরামর্শ নিয়ে চলা প্রয়োজন।
ভুল থেকে শেখা
কোনো ভুল পদক্ষেপ নেওয়া মানেই তুমি কম যোগ্যতাসম্পন্ন এমনটা নয়। বরং জীবনে চলার পথে ভুল হলো একটি অভিজ্ঞতা। ছোট ছোট ভুলের মধ্য দিয়ে নিজেকে পরে আরও বিচক্ষণ, সচেতন ও ইতিবাচক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যায়। তাই ভুল হলে মন খারাপ করে থাকার কিছু নেই। কিশোর-কিশোরীরাও অনেক ক্ষেত্রে গুছিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা রাখে। এই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ভুল থেকে বাঁচতে অবলম্বন করতে পার বিভিন্ন সতর্কতা।
ভুল স্বীকার করা
ভুল থেকে বাঁচতে চাইলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের ভুল স্বীকার করতে পারা। এতে করে হালকা অনুভব হয়। পাশাপাশি কেন ভুল হলো সেটি যাচাই করে নিজেকে শুধরে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
পরিবারের সাহচর্যে থাকা
কিশোর বয়সে বাবা-মা কিংবা পরিবারের বড়দের সঙ্গে মতপার্থক্য হতে দেখা যায়। মতের অমিলে কখনো কখনো বাবা-মায়ের ধারণাও ভুল হতে পারে। তবে কৈশোরে নিজেদের নিরাপত্তা, সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সামগ্রিকভাবে বড়দের সাহচর্য প্রয়োজন। আর এক্ষেত্রে নিজের পরিবারই সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু।
ভুল কাজের বিশ্লেষণ
নিজের ভুলের জন্য হীনম্মন্যতায় না ভুগে বরং ভুল কাজের একটি নোট তৈরি করো। এরপর কেন ভুল হলো নিজে বিশ্লেষণ করে গুছিয়ে লেখ। এতে করে যেকোনো কাজ করার আগে যুক্তিনির্ভর চিন্তা করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।