ভিডিও গেমের জগতে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ইন্ডিপেনডেন্ট বা ইন্ডি ঘরনার গেম। সহজলভ্যতা, স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম আর বৈচিত্র্যময় গল্পের জন্য কিশোর ও তরুণদের মধ্যে গেমগুলো বেশ জনপ্রিয়। সারা বিশ্বের মতো জেন জি প্রজন্মের ভেতর বাংলাদেশেও ইন্ডি গেমস নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। অনেক তরুণ গেমার নিজেদের গেম তৈরি করার স্বপ্ন দেখছেন।
ইন্ডি গেম কী ও কীভাবে এলো
ইন্ডি গেম হলো এমন এক ধরনের ভিডিও গেম- যা একক কোনো ব্যক্তি, ছোট দল বা ডেভেলপাররা বড় কোনো গেম প্রকাশনী ও তাদের প্রযুক্তিগত সাহায্য ছাড়াই তৈরি করে। স্বাধীনভাবে ডেভেলপ করা যায় বলে ভিন্নধারার গল্প, মৌলিকতা, সৃজনশীল উপস্থাপন এই গেমের বৈশিষ্ট্য।
১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে ভিডিও গেমজগতে প্রথম ইন্ডি গেমের ধারণা গড়ে ওঠে। ইন্ডি গেমের চর্চা প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হলেও বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে সারাবিশ্বেই এটি ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন প্ল্যাটফর্ম স্টিম চালু হলে বিভিন্ন ইন্ডি-ফ্রেন্ডলি মাধ্যমের উত্থান হয়। নব্বই থেকে দুই হাজার দশকে ‘শেয়ারওয়্যার’ মডেলের মাধ্যমে ব্যক্তি উদ্যোগে বা ছোট গ্রুপ করে অনেক ডেভেলপার তাদের গেম ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন। সে সময় ডুম, ব্রেইড এবং মাইনক্রাফটের মতো গেমগুলো ইন্ডি গেমকে মূলধারায় নিয়ে আসে। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডি গেম ডেভেলপারদের বড় রকমের অবদান ছিল।
কেন বাড়ছে জনপ্রিয়তা
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানির মতো দেশগুলোতে ইন্ডি গেমের রয়েছে বিস্তর আধিপত্য। ইন্ডি গেমের জন্মভূমি যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে এর বিশাল বাজার। অ্যানিমেশন শিল্পের জন্য পরিচিত দেশ জাপান ইন্ডি গেমের উপস্থাপনেও অনন্য শৈলীর নজর রেখেছে। ইউরোপীয় দেশগুলোতে গড়ে উঠেছে নানারকম ইন্ডি গেম ফেস্টিভ্যাল ও কমিউনিটি। আবার বাংলাদেশের মতো ভিডিও গেমজগতে তুলনামূলক নতুন দেশগুলোর কিশোর ও তরুণ গেমাররাও ঝুঁকছে ইন্ডি গেমের দিকে। ইন্ডি গেমের এই জনপ্রিয়তার মূলে রয়েছে গেম ডেভেলপ করার সুযোগ। এখানে তরুণ প্লেয়াররা শুধু গেম খেলারই না। বরং নিজেদের ইচ্ছামতো গেম তৈরি করার সুযোগও পান। আবার মানুষ স্বভাবতই নিয়মিত নতুন কিছু খুঁজতে ভালোবাসে। সহজে গেম ডেভেলপ করা যায় বলে এই প্ল্যাটফর্মে প্রতিনিয়ত উঠে আসে নতুনত্ব, আকর্ষণীয় গল্প। এ ছাড়াও যারা চাপমুক্তভাবে বিনোদনের উদ্দেশ্যে গেম খেলতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য ইন্ডি গেম সেরা প্ল্যাটফর্ম। সাধারণত ১৩ থেকে ৩০ বছর বয়সী গেমারদের মধ্যে দেখা যায় ইন্ডি গেমের সবচেয়ে জনপ্রিয়তা। ইন্ডির সহজলভ্যতা ও মনমতো সাজানো গল্প এই গেমকে জনপ্রিয় করে তুলেছে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী টিনএজার গেমারদের কাছে। আবার এই গেমে দেখা মেলে রেট্রো গ্রাফিক্স এবং গেমপ্লে মেকানিক্সের ব্যবহার। তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের কাছে ইন্ডি জনপ্রিয় এমন সব নস্টালজিক সৃজনশীল ও শৈল্পিক গ্রাফিক্সের কারণে।
নতুনদের জন্যে
ভিডিও গেমের জগতে যারা নতুন প্লেয়ার, তাদের শুরুর যাত্রায় চমৎকার মাধ্যম হতে পারে ইন্ডি গেম। ইন্ডি গেম সাধারণত এককভাবে খেলা যায় এবং তুলনামূলক কম প্রতিযোগিতামূলক। আবার অন্যান্য গেমের তুলনায় ইন্ডি গেম শেখা ও আয়ত্ত করাও অনেকটা সহজ। তা ছাড়া যেকোনো বড় আকারের AAA গেমের তুলনায় ইন্ডি ঘরানার গেমগুলো কম দামেও পাওয়া যায়। ইন্ডির নতুন গেমার হিসেবে খেলতে পারেন ‘এমং আস’ বা ‘স্টারডিউ ভ্যালি’-এর মতো গেমগুলো। আবার চাইলে ইন্ডি গেম নিজেই তৈরি করতে পারেন তরুণ, এমনকি টিনএজাররাও। তবে এর জন্য প্রয়োজন গেম ইঞ্জিন ব্যবহারের দক্ষতা, গেম ডিজাইন ও আর্ট সম্পর্কে ধারণা এবং প্রোগ্রামিং সম্পর্কিত দক্ষতা।
জনপ্রিয় কিছু ইন্ডি গেম
বিশ্বব্যাপীই বেশকিছু ইন্ডি গেম কিশোর ও তরুণ প্লেয়ারদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আবার বাংলাদেশি তরুণদের তৈরি কয়েকটি ইন্ডি গেমও আমাদের গেমজগতে উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
- মাইনক্রাফট একটি জনপ্রিয় ওপেন-ওয়ার্ল্ড স্যান্ডবক্স গেম। যেখানে খেলোয়াড়রা নিজেদের মতো করে দুনিয়া তৈরি করতে পারেন।
হলো নাইট একটি চমৎকার ২ডি অ্যাকশন-অ্যাডভেঞ্চার গেম। এখানে গভীর গল্প ও চ্যালেঞ্জিং যুদ্ধ রয়েছে। - আন্ডারটেল একটি আরপিজি গেম, যেখানে খেলোয়াড়দের পছন্দ অনুযায়ী গল্প পরিবর্তিত হয়।
- সেলেস্তে একটি কঠিন প্ল্যাটফর্মার গেম, যেখানে আত্মোন্নয়ন ও সংগ্রামের গল্প বলা হয়েছে।
- আগন্তুক বাংলাদেশি তরুণদের তৈরি একটি জনপ্রিয় অ্যাকশনধর্মী গেম।
- হিরোজ অব একাত্তর আমাদের দেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি জনপ্রিয় ইন্ডি গেম।
ইন্ডি গেম সম্পর্কিত টুর্নামেন্ট
বিশ্বব্যাপী ইন্ডি গেমকে ঘিরে বেশকিছু টুর্নামেন্ট এবং প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়। এসব প্রতিযোগিতায় গেম ডেভেলপারদের নিজেদের ভাবনা ও গেম প্রদর্শনীর সুযোগ থাকে। আমাদের দেশে এখনো ইন্ডি গেমের সরাসরি আয়োজন না থাকলেও অনলাইনভিত্তিক এই টুর্নামেন্টগুলোতে অংশ নেওয়া যায়।
ইন্ডিপেনডেন্ট গেমস ফেস্টিভ্যাল
১৯৯৮ সাল থেকে শুরু হওয়া বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ইন্ডি গেম প্রতিযোগিতাগুলোর এটি অন্যতম। প্রতিবছর এটি গেম ডেভেলপারস কনফারেন্সের অংশ হিসেবে এই টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। ডেভেলপাররা তাদের গেম জমা দিয়ে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জিততে পারেন।
গেম ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ
এটি একটি বার্ষিক ইন্ডি গেম প্রতিযোগিতা- যেখানে ইন্ডি ডেভেলপার, ছাত্র এবং গেমিংয়ে উৎসাহীরা অংশ নিতে পারেন। অনলাইনে আয়োজিত হয় বলে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে অংশগ্রহণ করা সম্ভব।
গ্লোবাল গেম জেম
এই টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারীদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (৪৮ ঘণ্টা) নতুন একটি গেম তৈরি করতে হয়। এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে যেকোনো বয়সী ইন্ডি গেম ডেভেলপার। গেম ডেভেলপারদের মধ্যে এটি অন্যতম জনপ্রিয় আয়োজন।