প্রতি বছর অন্তত ১০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য মিশে যায় সমুদ্রের পানিতে। সাধারণত সমুদ্রের তলদেশে যেতে যেতে সেগুলো প্লাস্টিকের কণা আকারে জমা হয়। সামুদ্রিক প্রাণীরা অনেক সময় খাবার ভেবে খেয়ে ফেলে সেসব প্লাস্টিকের কণা। কিন্তু যদি চুম্বকের সাহায্যে সমুদ্রের প্লাস্টিকগুলো শুষে নেওয়া যায়, তবে কেমন হয়? এমন প্রশ্নই মনে এসেছিল আয়ারল্যান্ডের এক কিশোর ফিওন ফেরেইরার। প্রাণী, মানুষ আর সমুদ্র বাঁচাতে ফেরেইরার চুম্বক পদ্ধতি নিয়ে আজকের গল্প।
প্রায় এক যুগেরও আগের কথা। ফিওন ফেরেইরার বয়স তখন মাত্র ১২ বছর। সে সময় তিনি বাস করতেন আয়ারল্যান্ডের সমুদ্র উপকূলবর্তী বালিডেহব গ্রামে। শৈশবে প্রতিদিন সমুদ্রতীরে ঘুরে বেড়ানো ছিল ফেরেইরার শখ। ঘুরতে ঘুরতে এক সময় লক্ষ্য করেন সমুদ্রের তীরজুড়ে ছোট-বড় অসংখ্য প্লাস্টিক পণ্য। প্রাকৃতিক পরিবেশে ছড়িয়ে থাকা এসব বর্জ্য দেখতে মোটেই ভালো লাগত না তার। ধীরে ধীরে জানতে পারেন প্লাস্টিকের এসব বর্জ্য শুধু সৌন্দর্যই নষ্ট করে না; সেই সঙ্গে পরিবেশ, মানুষ ও সমুদ্রে থাকা প্রাণীদের জানমালের ক্ষতিও করে। এ ছাড়া সমুদ্রের তলদেশের পানিতে মিশে রয়েছে খালি চোখে দেখা যায় না এমন প্রচুর পরিমাণে মাইক্রো প্লাস্টিক। এসব ছোট প্লাস্টিকের কণা তীরে এসে ভেড়ে না। কুড়িয়ে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে পানি থেকে সহজে আলাদা করাও যায় না। বিষয়টি কিশোর ফেরেইরাকে সে সময় বেশ চিন্তিত করে তোলে।
সমুদ্রের পানি থেকে এসব প্লাস্টিকের কণা কীভাবে আলাদা করা যায়, সেটি ভাবতে ভাবতেই এক সময় ফেরেইরার মাথায় আসে, পানিতে থাকা মাইক্রো প্লাস্টিকগুলো যদি চুম্বকে আটকে ফেলা যায় তবে মন্দ নয়! যেমন ভাবনা তেমন কাজ। প্লাস্টিক-দূষণ রোধের আশায় ফেরেইরা প্রথমে তৈরি করেন ফেরোফ্লুইড বা তরল চুম্বক। উদ্ভিজ্জ তেলের সঙ্গে আয়রন অক্সাইড পাউডার মিশিয়ে তৈরি করেন প্রাকৃতিক ফেরোফ্লুইড। এবার সেই ফেরোফ্লুইড গাড়ির টায়ার, প্লাস্টিক বোতল, ওয়াশিং মেশিনে কাপড় ধোয়ার পানিসহ যেখানে যেখানে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকে, সেসব জায়গায় ব্যবহার করতে শুরু করেন। ফেরেইরা লক্ষ করেন ফেরোফ্লুইডে প্লাস্টিকের কণা আটকাতে শুরু করেছে। এর পর আরেকটি চুম্বকের সাহায্যে প্লাস্টিকের কণাগুলোকে তুলে নিয়ে তরল দ্রবণটি আলাদা করে ফেলা যায়। এভাবে কয়েক বছর প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর তিনি তার এই পদ্ধতি নিয়ে নিশ্চিত হন।
২০১৯ সালে ফেরেইরা কিশোর-তরুণ বিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা গুগল সায়েন্স ফেয়ারে অংশ নিলে তার এই মাইক্রোপ্লাস্টিক সরানোর পদ্ধতি আলোচনায় আসে। পরিবেশের কোনোরকম ক্ষতি ছাড়াই পানি থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক সরানোর পদ্ধতি আবিষ্কারের জন্য সে সময় তিনি প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন।
তবে এটি ছিল কিশোর ফেরেইরার সাফল্যের প্রথম ধাপ। বর্তমানে তরুণ এই বিজ্ঞানী রসায়ন শাস্ত্রে পড়াশোনা করেছেন নেদারল্যান্ডসের গ্রোনিঞ্জেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। পাশাপাশি খাবার পানি থেকে প্লাস্টিক দূরীকরণ ডিভাইস এবং সমুদ্রে চলাচলকারী জাহাজে চুম্বকীয় ডিভাইস স্থাপনের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।