জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের (৫৫তম ব্যাচ) শিক্ষার্থীদের গভীর রাতে মাঠের মধ্যে ডেকে নিয়ে ‘ম্যানার’ বা শিষ্টাচার শেখানোর নামে র্যাগিং করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার কথা লিখিতভাবে স্বীকার করেছেন একই বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের (৫৪তম ব্যাচ) শিক্ষার্থীরা।
গতকাল শুক্রবার রাত ১১টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে এ নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।
পরে খবর পেয়ে প্রক্টরিয়াল টিম ও জাকসুর অ্যান্টি-র্যাগিং সেলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের হাতেনাতে ধরেন।
শনিবার (৪ জুলাই) এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
ভুক্তভোগী ও প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গতকাল শুক্রবার রাতে ইতিহাস বিভাগের ৫৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা নবীনদের স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে ডেকে আনেন। সেখানে যাওয়ার পর নবীন শিক্ষার্থীদের কান ধরানো, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং ফরমাল পোশাকের নিয়ম শেখানোর নামে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক হেনস্তা করা হতে থাকে।
র্যাগিং চলাকালে এক নবীন শিক্ষার্থী কৌশলে ঘটনার ভিডিও ধারণ করে জাকসুর অ্যান্টি-র্যাগিং সেলের এক সদস্যের কাছে পাঠান। খবর পেয়ে প্রক্টরিয়াল টিম ও জাকসুর অ্যান্টি-র্যাগিং সেলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘটনার সত্যতা পায়। অভিযুক্তদের হাতেনাতে ধরে নিরাপত্তা অফিসে নিয়ে আসে। সেখানে ভিডিও যাচাই করে অভিযুক্তদের ভিডিও ও লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়।
নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মো. এহসানুল হক বলেন, “সেখানে আমাদের বাবা-মা তুলে গালাগাল ও কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। ফরমাল পরিচয়ের নামে আমাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছিল। পরে প্রক্টর স্যারসহ অন্যরা এসে আমাদের উদ্ধার করেন।”
আরেক ভুক্তভোগী রাজ খান বলেন, ’এর আগেও সেন্ট্রাল ফিল্ডে আমাদের গভীর রাত পর্যন্ত নির্যাতন করা হয়েছে। এছাড়া সেমিনার, ক্লাসরুমের করিডর, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ও আবাসিক হলে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নিয়মিত হেনস্তা করা হচ্ছে। আমরা এই জঘন্য ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’
ভুক্তভোগীদের দাবি, অনবরত এমন নির্যাতনে তাদের পড়াশোনার মারাত্মক ক্ষতির পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে।
এদিকে ঘটনার পর ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের ১৩ জন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, ঘটনার দায় স্বীকার করে অভিযুক্ত ব্যাচের শ্রেণি প্রতিনিধির (সিআর) স্বাক্ষরিত একটি লিখিত বিবৃতিতে জানানো হয়, ‘আমরা সবাই ইতিহাস বিভাগের ৫৫তম আবর্তনের ১৩ জন ছাত্রকে মেনার শিখানোর নামে জাবি স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে ডেকে নিই এবং র্যাগ দিই।’
লিখিত বিবৃতিতে অভিযুক্ত ১২ জন শিক্ষার্থীর পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে। তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ৫৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। অভিযুক্তরা হলেন- সুভাশীষ রায়, নাছিম উদ্দিন মজুমদার, আবু আবতাহী অনিক, নাইমুল হাসান, আব্দুল্লাহ মাহদী, ইসফাক হাদী সিক্ত, মো. রায়হান খান, কাজী শাহ জামসেদ আলম নাবিল, সাইফুল্লাহ মানসুর আনান, মো. মাহফুজুর রহমান অন্ত, শ্রী কার্তিক চন্দ্র রায় এবং নাইম আহমেদ সজিব।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ’রাত ২টার দিকে কল পেয়ে আমি ঘটনাস্থলে যাই এবং র্যাগিংয়ের অভিযোগের সত্যতা পেয়ে তাদের হাতেনাতে ধরি। এরপর সবাইকে নিরাপত্তা অফিসে নিয়ে এসে ভিডিও ও লিখিত স্টেটমেন্টের তথ্য নেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ’এই তথ্যগুলো প্রক্টরিয়াল বডির সভায় আলোচনার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হবে এবং সে অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
‘অভিযুক্তদের স্বীকারোক্তি ও আমাদের কাছে যতটুকু এভিডেন্স (প্রমাণ) আছে, তা দিয়ে তাদের সাময়িক বহিষ্কার করা যাবে’ বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. রাশিদুল আলম বলেন, সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের উপস্থিতিতে র্যাগিংয়ের সময় তাদের হাতেনাতে ধরা হয়েছে এবং দুই পক্ষ থেকেই লিখিত অভিযোগ ও স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী এ বিষয়ে দ্রুত যথাযথ ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমানউল্লাহ/খাদিজা রুমি/