সকাল সাড়ে ৭টা। সিরাজগঞ্জের বেলকুচি পৌর কার্যালয়ের সামনের আঞ্চলিক সড়ক ধীরে ধীরে ভরে উঠছে ধান ও সরিষার বস্তায়। আশপাশের চরাঞ্চল থেকে কৃষকরা নৌকা ও ভ্যান গাড়িতে করে ধান, গম, ভুট্টা আর সরিষার বস্তা আনছেন। একটু পরেই শুরু হলো দরদাম আর কেনাবেচার ধুম। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুরো সড়ক যেন হাটে পরিণত হলো।
গত বুধবার সেখানে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়। তবে এই দৃশ্য নতুন নয়। প্রতি সপ্তাহের বুধবার ওই আঞ্চলিক সড়কটি হয়ে ওঠে কৃষিপণ্যের বড় হাট। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কেনাবেচা চলে। তবে এই হাট শুধু কেনাবেচার আনন্দ নয়, সঙ্গে নিয়ে আসে দুর্ভোগ আর ঝুঁকি।
মেঘুল্লা চর, ক্ষিদ্রচাপড়ি, বাঙ্গা চর, ক্ষিদ্রমাটিয়া, জামতৈল, চরবেল, মেহেরনগর, দিগুলিয়া, সরদুল, গাপচাপড়ি ও বড়ধুল ইউনিয়নসহ অন্তত এক ডজন গ্রামের কৃষক তাদের উৎপাদিত ধান-সরিষা এই হাটে নিয়ে আসেন। স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি টাঙ্গাইল ও আশপাশের জেলা থেকেও ব্যাপারীরা আসেন। ফলে এখানে জমে ওঠে লাখ টাকার লেনদেন।
ধান ব্যবসায়ী আব্দুল মতিন জানান, ‘আমি টাঙ্গাইলে পাঠানোর জন্য ৫০-৬০ মণ ধান কিনেছি। তবে রাস্তার ওপর হাট বসার কারণে আমাদেরও সমস্যা হয়। যেখানে থাকা উচিত মুক্ত চলাচল, সেখানে এখন বসছে হাট। নসিমন, ভ্যান, ট্রাক আর অটোরিকশা এলোমেলোভাবে রাখা হয়। ফলে যানজট লেগেই থাকে। দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে।’ পথচারী কামাল উদ্দিন বলেন, ‘হাটের দিন প্রচণ্ড যানজট হয়। আমাদের চলাচলে কষ্ট হয়।’ অটোরিকশাচালক ইয়াসিন বলেন, ‘ধান কেনাবেচার সময় রাস্তার ধারে গাড়ি খালে পড়ে যাওয়ার ভয়ের মধ্যে কাজ করতে হয়।’
স্থানীয়রা জানান, এই সড়ক দিয়ে সিরাজগঞ্জ শহর, ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক এবং এনায়েতপুর খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজে যাতায়াত করা হয়। হাট বসার দিনগুলোতে কয়েক ঘণ্টা যাতায়াত কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে। হাটটির কোনো সরকারি ইজারা নেই। অথচ প্রতি বস্তা ধানে ৩৫-৪০ টাকা, সরিষায় ৬০-৭৫ টাকা করে খাজনা তোলা হয় স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে। এক দিনে প্রায় ২০ লাখ টাকার কেনাবেচা হয়, অথচ সরকার পায় সামান্যই।
পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা আমিনুজ্জান বলেন, ‘আমরা বহুবার হাট ইজারা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কেউ আগ্রহ দেখাননি। এতে সরকারের বছরে কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে।’
বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক আফরিন জাহান বলেন, ‘আঞ্চলিক সড়কে হাট বসানো উচিত নয়। আমি আগে এ বিষয়ে অবগত ছিলাম না, এখন জানলাম। ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি হাটটি অন্য কোথাও স্থানান্তরের সুযোগ আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।’
ধানের মৌসুমে কৃষকরা যেমন ভরসা খুঁজে পান এই হাটে, তেমনি সড়কজুড়ে হাট বসে যান চলাচল হয়ে ওঠে দুঃসহ। কৃষক ও ক্রেতাদের সুবিধা যেমন আছে, তেমনি জনজীবনে যোগ হচ্ছে দুর্ভোগ। এখন প্রশ্ন- হাট কি সড়কের বিকল্প পাবে, নাকি এ দুর্ভোগ।