আজ ছুটির দিন। দুপুরে আমরা একসঙ্গে খাচ্ছি। মা ডাক্তার। বাবা এনজিওতে চাকরি করেন। সকালে নাশতার পরে সবাই কাজে বের হয়ে যায়। আমি যাই ইশকুলে। শুক্রবার দুপুরে আমরা একসঙ্গে খাই।
আমার খাওয়া শেষ হয়ে গেছে। বেসিনে হাত ধুতে গেছি। মা বললেন, কী হলো, ভাত রেখে দিলে কেন? শরীর খারাপ লাগছে?
বললাম, প্লেটের খাবার কুকুরের জন্য।
বাবা বিস্মিত হয়ে তাকালেন। অবাক হলাম। খাওয়া শেষে প্লেটে আজই প্রথম আমি খাবার রেখে দিচ্ছি না। এই ঘটনা ঘটছে অনেকদিন থেকে। বাবা-মা খেয়াল করেননি!
বাবা কিছু বললেন না। মা বললেন, তোমার কুকুর আছে, বলোনি তো! কোথায় থাকে? তার কি কোনো নাম রেখেছ?
বাবা খাওয়া বন্ধ করে হাত গুটিয়ে রেখেছেন। তিনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, তাকে একসঙ্গে দুটো প্রশ্ন করেছ। একে একে প্রশ্ন করো।
বললাম, আমার কুকুরের নাম লাইকা। পৃথিবীর প্রথম মহাকাশচারী কুকুরের নাম হচ্ছে লাইকা। বইয়ে পড়েছি।
বাবা হাসলেন। আমার বাবা দেখতে অতি সুদর্শন। হাসলে তাকে আরও সুদর্শন দেখায়। মাকে বললাম, আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের নিচে অনেকগুলো কুকুর আছে। রাত হলেই তাদের চিৎকার শুনতে পাও।
মা চোখ কুঁচকে বললেন, রাস্তার কুকুর! ডেঞ্জারাস। ওদের তো ইঞ্জেকশন দেওয়া নেই।
বাবা বললেন, সিটি করপোরেশন নিয়মিত রাস্তার কুকুরদের ইঞ্জেকশন দেওয়ার ব্যবস্থা করে।
বাবার কথা শেষ হলে আমি বললাম, সেসব কুকুরের একটা কুকুর আমার। আমি তার নাম রেখেছি লাইকা।
মা আর কিছু বললেন না। বাবা খাবারে মনোযোগ দিলেন। আমার প্লেট থেকে খাবার, মাংসের হাড় আর এক টুকরো মাংস তুলে ছোট পলিথিনে ভরে নিলেন।
বাবা আর মা আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। আমি কুকুরের জন্য খাবার নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে লিফট দিয়ে নেমে গেলাম।
লাইকা ঠিক বুঝতে পারে আমি খাবার নিয়ে কখন আসব। সে এসে গেটের পাশে বসে থাকে। খাবার নিয়ে গেলে উঠে দাঁড়ায়। লেজ নাড়াতে থাকে। তার লেজ নাড়ানো দেখে মনে হয় লাইকা খুশি হয়েছে। আরও একটা ব্যাপারে অবাক হয়েছি। শুক্রবার আর শনিবার এই দুদিন আমার ইশকুল ছুটি থাকে। অন্যদিনের চেয়ে লাঞ্চ করি আগে। খাবার নিয়ে এসে দেখি লাইকা গেটের বাইরে বসে আছে। অন্যদিন ইশকুল ছুটি হতে দেরি হয়। বিকাল ৪টার সময় লাইকার জন্য খাবার নিয়ে আসি। সে কোনো অভিযোগ করে না। আমাকে বুঝতে পারে। লাইকা সেই দিনগুলোতে বিকাল ৪টার সময় খাবারের জন্য অ্যাপার্টমেন্টের গেটে আসে।
আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের গেটের দারোয়ান সিরাজ আঙ্কেল অতিরিক্ত ভালো মানুষ। লাইকার জন্য খাবার নিয়ে এলে তিনি গেট খুলে দেন। লাইকা গেট দিয়ে ঢুকে গ্যারেজে এসে খায়।
সিরাজ আঙ্কেল বলেন, বাইরে খাবার দিলে আরও অনেক কুকুর এসে তোমার লাইকার সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করবে। খাবার সব সময় আরাম করে খেতে হয়। তাতে হজম ভালো হয়।
বললাম, আঙ্কেল, ওই কুকুরগুলোরও তো ক্ষুধা লাগে!
সিরাজ আঙ্কেল হেসে বললেন, তাদের খাবার ব্যবস্থা আছে, মা। তাদের খাবার নিয়ে তুমি চিন্তা করো না।
সিরাজ আঙ্কেল তাদের খাবার কী ব্যবস্থা করেছেন জানি না। তবে শুনেছি তিনি বিভিন্ন বাসা থেকে মাছের কাঁটা, মাংসের হাড়, বিস্কুট, পাউরুটি এসব এনে কুকুরদের খাওয়ান।
আমার নাম মিষ্টু। দাদাজি রেখেছেন। ইশকুলের খাতায় আমার অনেক বড় নাম লেখা আছে। সে নাম থাক। নভেম্বর মাসে আমাদের ইশকুলে বার্ষিক পরীক্ষা হবে। বার্ষিক পরীক্ষা হয়ে গেলে আমি ক্লাস ফোরে ওঠে যাব। পরীক্ষার পর দাদার বাড়িতে বেড়াতে যাব। আমার দাদার বাড়ি কুষ্টিয়া। সেখানে দাদা আর দাদি থাকেন। আমরা থাকি ঢাকায়। মোহাম্মদপুরে। এলাকার নাম মনসুরাবাদ। রোড নম্বর ২। আদাবরের পরে মনসুরাবাদ।
দাদার কাছে বেড়াতে গেলে ভীষণ মজা হয়। দাদা গাছ, ফুল, নানারকম পাখি আর কাঠবিড়ালী ভালোবাসেন। দাদাজিকে দেখেছি খাওয়া শেষে সব সময় প্লেটের কোনায় খাবার রেখে দেন। সেই খাবার তিনি কুকুরকে খেতে দেন। আমিও দাদাজির মতো কুকুরের জন্য খাবার প্লেটে রেখে দিই।
আজ আমার প্রবল আনন্দের দিন। আমার ইশকুল ছুটি হয় বিকাল ৩টায়। অফিস শেষে বাবা ফেরেন সন্ধ্যা ৬টায়। মায়ের ফিরতে রাত হয়। আজ মা ফিরেছেন দুপুর ২টায়। তিনি লাইকার জন্য খাবারের প্লেট এনেছেন। স্টিলের প্লেট। তাতে দুটো ভাগ। এক ভাগে খাবার দিতে হবে আর আরেক ভাগে পানি। লাইকার খাবারের প্লেট পেয়ে প্রচণ্ড খুশি হয়েছি। মাকে জড়িয়ে ধরে অনেকগুলো চুমু দিয়েছি। মা বলেছেন পঁচিশটা। প্লেটে খাবার পেয়ে লাইকাও খুব খুশি হয়েছে। এখন সে নিজের প্লেটে খাবার খায়।
এবার বলি আসল ঘটনা। মায়ের সঙ্গে আমি গেলাম খালামনির বাসায়। খালামনি থাকেন মনসুরাবাদ চার নম্বর রোডে। একদম কাছে। ছোট মামা আমার জন্য ইংল্যান্ড থেকে খেলনা নিয়ে এসেছে। সেটা টেনিস বলের মতো একটা বল। বাক্সে থাকে। তাকে যদি বলা যায়, কাম আউট।
বল লাফ দিয়ে বাক্স থেকে বের হয়ে আসে। তাকে বললাম, জাম্প আপ।
বল লাফাতে থাকল।
বললাম, স্টপ।
বল থেমে একেবারে স্থির হয়ে গেল।
তাকে বাংলা শেখানোর চেষ্টা করছি। বল বাংলা শিখতে পারছে না। এই খেলনা খালামনিকে না দেখানো পর্যন্ত আমার অস্থির লাগছে। ব্যাকপ্যাকে বল ঢুকিয়ে নিলাম। কাঁধে ব্যাকপ্যাক নিয়ে মায়ের সঙ্গে চলে গেলাম খালামনির বাসায়।
খালামনিকে মা আগেই ঘটনা ফোনে বলেছেন। খালামনি প্রবল আগ্রহ নিয়ে বসে আছেন। কাঁধ থেকে ব্যাকপ্যাক নামিয়ে দেখি তার জিপার খোলা। ভেতরে বল নেই। আমার অবস্থা হয়ে গেল এলোমেলো। বল আমি ব্যাগে ঢুকিয়েছি। তাড়াহুড়ো করে ব্যাগের জিপার আটকাতে ভুলে গেছি। নিশ্চয় রাস্তায় পড়ে গেছে বল!
খালামনি থাকেন পাঁচতলায়। লিফট দিয়ে নামতে দেরি হবে। ছুটে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলাম। অ্যাপার্টমেন্টের গেট দিয়ে বেরোতেই দেখি লাইকা শুয়ে আছে। কখন এসেছে জানি না। সে হয়তো আমাদের সঙ্গেই আসছিল, খেয়াল করিনি। মাটির ওপর সামনে পেতে রাখা লাইকার দু’পায়ের ওপর আমার সেই বলের বাক্স।
লাইকা ঘেউ শব্দে কিছু বলল। বুঝতে পারলাম না। মনে হয় বলল, অ্যাপার্টমেন্টের দারোয়ান তাকে ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। লাইকা দু’পায়ের ওপর থেকে বলের বাক্স তুলে মুখে নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে দিল। আমি আনন্দে লাইকাকে জড়িয়ে ধরলাম। সে লেজ নেড়ে আদর নিতে থাকল।
মোহনা জাহ্নবী