পুটুলের বয়স সাত বছর। ও থাকে বকুলতলি নামে একটা ছোট্ট গ্রামে। পুটুল একটু চঞ্চল, একটু কৌতূহলী আর সব সময় কিছু একটা ঘাঁটাঘাঁটি করে। গ্রামের সবাই বলে, পুটুল মানেই গোলমালের আরেক নাম!
পুটুলের প্রিয় জিনিস হলো একটা হলুদ ব্যাঙ। তার নাম টুনটুনি। ব্যাঙটা দিনে ঘুমায়, আর রাতে পুটুলের হাতের তালুতে বসে গান গায়- ট্যাঁ ট্যাঁ ট্যাঁ।
পুটুল জানে, টুনটুনি সাধারণ ব্যাঙ না। ও নদীর ভাষা বুঝে।
বকুলতলি গ্রামের পাশে বয়ে চলেছে ব্রহ্মপুত্র নদীর এক পুরোনো শাখা। গ্রামের লোকেরা বলে, সেই নদীর নিচে এক ভূত থাকে। দিনের বেলায় সে ঘুমায়, কিন্তু রাত নামলেই সে পানির ঢেউয়ে ভেসে বেড়ায়! নদীর নাম তারা দিয়েছে ভূতনদী। সূর্য ডোবার পর কেউ সাহস করে নদীর পাড়ে যায় না। আর যারা গেছে, তারা নাকি ফিরে এসে ঠিকমতো কথা বলতে পারেনি! পুটুল এসব বিশ্বাস করে না।
একদিন রাতে পুটুল বলল টুনটুনিকে, চলো, আমরা ভূতনদীর কিনারায় যাই। আমি দেখে আসব সেই ভূত আসলে কী।
চাঁদের আলোয় পুটুল আর টুনটুনি চলে গেল নদীর পাড়ে। নদী চুপচাপ। একটাও শব্দ নেই। পুটুল হঠাৎ দেখে পানির ওপর একটা কালো ছায়া ভেসে বেড়াচ্ছে। সে ডাকল, এই ভূত সাহেব! আপনি আছেন নাকি?
সঙ্গে সঙ্গে ভেসে এল এক মোটা আওয়াজ, কে ডাকে? কে সাহস করে নদীর ঘুম ভাঙায়?
পুটুল অবাক, কিন্তু ভয় পায় না। সে বলল, আমি পুটুল। তুমি ভূত নাকি?
নদীর মাঝে কালো ছায়াটা ধীরে ধীরে বিশালাকৃতির এক হাঁসের আকার পেল। গায়ে পচা পাতার মতো পালক, চোখে লাল আলো। হাঁসটা বলল, আমি এই নদীর প্রহরী। নদী রক্ষা করা আমার কাজ।
পুটুল অবাক হয়ে হাঁস ভূতের দিকে তাকিয়ে থাকে। হাঁস বলে, সবাই নদীর পানি নোংরা করে। নদীর বুক কেটে রাস্তা বানায়, মাছ ধরে, বালু তোলে। এভাবে চললে নদী বাঁচবে? তাই আমি ভয় দেখিয়ে নদী রক্ষা করি।
পুটুল চুপ করে শোনে। টুনটুনি ব্যাঙ ফিসফিস করে বলে, দেখলি! আমি তো আগেই বলছিলাম, নদীর ভূত আসলে ভালো ভূত।
পুটুল ধীরে ধীরে বলে, ভূত ভাই, আমি ভয় পাই না। আমি চাই নদী আবার হাসুক। আমাকে বলো কী করতে হবে।
পুটুল পরদিন সকালে ঘোষণা দিল, নদীর অনেক দুঃখ। এই দুঃখ দূর করতে আমরা সবাই মিলে নদীর তীরে গাছ লাগাব। পানিতে ময়লা ফেলব না, আর নদীর গান গাইব!
প্রথমে কেউ বিশ্বাস করল না। কিন্তু যখন পুটুল নদীর পাড়ে একাই দাঁড়িয়ে গান গাইতে লাগল, ভূত নয়, নদী মায়া, তার বুকেতে স্বপ্ন যায়া! তখন গ্রামের শিশুরা, তারপর মুরুব্বিরাও এসে পাশে দাঁড়াল।
ধীরে ধীরে নদীর পাড়ে গাছগাছালি ফিরল। মাছ দেখা গেল পানির মধ্যে। একদিন দুপুরে হঠাৎ করে নদীর ভেতর থেকে ভেসে এল সেই হাঁস ভূতের চেনা আওয়াজ, পুটুল, আমি যাচ্ছি। তোমরা জেগে আছো, এখন আর আমি ভয় দেখাব না।
পুটুল হাসল। টুনটুনি বলল, তুই তো আসলেই ভূত তাড়ালি!
গ্রামের লোকেরা বলল, পুটুল শুধু ভূত তাড়ায়নি, নদীকে বাঁচিয়েছে।