গ্রামের নাম বকুলতলী। চারপাশে ধানখেত, মাঝ দিয়ে মাটির পথ। গ্রামের একপাশে আছে ফাঁকা মাঠ। সেখানে ক্রিকেট খেলা হয়, মেয়েরা বসে কাঁড়ি কাঁড়ি শাক কেটে নেয়। কিন্তু একসময় এই মাঠ ছিল গ্রামের সেরা জোনাকির মাঠ। সন্ধ্যা হলেই মাঠ জ্বলে উঠত হাজারো জোনাকির আলোয়। যেন ছোট ছোট তারা নেমে এসেছে মাটিতে।
কিন্তু আজকাল আর তেমন জোনাকি দেখা যায় না। বিদ্যুতের লাইট, মোবাইল ফোনের আলো দেখে সব জোনাকি লুকিয়ে গেছে। শুধু মাঝে মাঝে অল্প কিছু ভেসে ওঠে ঘাসের ফাঁকে।
মাঠের এক কোনায় দাঁড়িয়ে থাকে রাবি। ক্লাস ফাইভে পড়ে। সব সময় অদ্ভুত চিন্তা করে। গ্রামের বাকি ছেলেরা ক্রিকেট খেলে, রাবি খেলতে গেলেও ওকে কেউ নেয় না। ও নাকি বলটা ভালো ধরতে পারে না, ব্যাটে লাগাতে পারে না। তাই রাবি মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকে।
ওর কাছে মাঠ মানে শুধু ক্রিকেট না। মাঠ মানে আকাশ দেখা, ঘাসে বসে কান পাতলে ঝিঁঝি পোকাদের গান শোনা। আর ওর ভালো লাগে সবচেয়ে বেশি সন্ধ্যার পর যখন দুয়েকটি জোনাকি দেখা দেয়।
একদিন স্কুল থেকে ফিরে রাবি মাঠে আসে। তখন সূর্য ডুবে গেছে, আকাশে রঙিন মেঘ। মাঠে সবাই ক্রিকেট খেলছে। কিন্তু হঠাৎ রাবি টের পায়, তার পাশে কেউ দাঁড়িয়ে।
একটা মেয়ে। ওর সমবয়সী হবে। অচেনা মুখ। পরে আছে নীল ফ্রক, হাতে একটা ছোট খাতা। মৃদু হেসে বলে, তুমি এখানে দাঁড়িয়ে কী করো?
রাবি একটু লজ্জা পেয়ে বলে, আমি দেখি… জোনাকি।
মেয়েটি অবাক হয়ে বলে, জোনাকি? এখন তো জোনাকি কমে গেছে।
রাবি মাথা নাড়ে, হ্যাঁ, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, ওরা এখনো আছে। শুধু কেউ খেয়াল করে না।
মেয়েটির নাম মীম। সবে গ্রামে এসেছে। ওর বাবা নতুন হেডস্যার হয়ে স্কুলে যোগদান করেছেন। মীমও রাবির ক্লাসেই ভর্তি হয়েছে। কিন্তু ও একেবারেই শহর থেকে আসা। মাঠে কাদা মেখে খেলতে ওর ভালো লাগে না। বরং খাতায় কিছু লিখতে, আঁকতে ভালোবাসে।
সেদিন থেকে রাবি আর মীম প্রতিদিন সন্ধ্যায় মাঠে দাঁড়ায়। বাকি ছেলেরা যখন বলের পেছনে ছুটে, তখন তারা দুজন মাটিতে বসে জোনাকি খোঁজে। প্রথমে হয়তো দুয়েকটি দেখা যায়। তারপর ধীরে ধীরে যখন বাতাস ঠাণ্ডা হয়, ঘাসের ফাঁক থেকে আস্তে আস্তে আলো ঝলমল করে।
মীম বলে, দেখো, ওরা যেন লাইটবাল্ব।
রাবি মুচকি হেসে বলে, না, ওরা হলো আকাশের তারার বন্ধু। নিচে নেমে আসে আমাদের সঙ্গে খেলতে।
একদিন মীম ওর খাতায় একটা ছবি আঁকে। মাঠের ছবি, আকাশের নিচে ঘাস, আর অনেকগুলো জোনাকি। নিচে লিখে রাখে, আমাদের মাঠ-তারাদের বন্ধু।
কিছুদিন পর স্কুলে অনুষ্ঠান হয়। সবাই গান গায়, নাচ করে। রাবি আর মীম মিলে একটা ছবি প্রদর্শনীতে দেয়। সেই জোনাকি মাঠের ছবি। অনেকে দেখে হাসে, কেউ কেউ বলে, আজকাল তো জোনাকি নেই, এগুলো শুধু গল্প।
কিন্তু অনুষ্ঠানের দিন রাতে আশ্চর্য একটা ঘটনা ঘটে। বিদ্যুৎ চলে যায়। চারদিক অন্ধকার। সবাই দিশাহারা। তখন হঠাৎ করে সেই মাঠ জ্বলে ওঠে। হাজার হাজার জোনাকি উঠে আসে ঘাস থেকে। যেন আলোয় ভরে গেছে চারদিক। গ্রামের সবাই তাকিয়ে থাকে অবাক হয়ে। শিশুরা দৌড়ে যায় মাঠে। মুরব্বিরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন। কেউ বলেন, এ তো সেই পুরোনো দিনের মাঠ।
রাবি আর মীম এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকে। মীম খাতায় লেখা সেই কথাটা মনে মনে পড়ে, আমাদের মাঠ-তারাদের বন্ধু।
ওরা দুজন বুঝতে পারে, জোনাকিরা কাউকে ছেড়ে যায় না। শুধু দরকার বিশ্বাস আর অপেক্ষা। এরপর থেকে গ্রামের বাচ্চারা সন্ধ্যায় মাঠে আসে। কেউ মোবাইলের আলো জ্বালায় না। সবাই জোনাকির আলো দেখে। খেলাধুলার ফাঁকেও তারা দাঁড়িয়ে যায় একটু চুপচাপ।
এখন রাবি আর একা না। মীমও একা না। তাদের সঙ্গে পুরো গ্রামের ছেলেমেয়েরা। আর সেই পুরোনো মাঠটা? সে আবার নতুন করে আলোয় ভরে উঠেছে।