গো-চারণ ভূমি খ্যাত সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়া। এ অঞ্চলে লাখ লাখ গবাদিপশুর জন্য দানাদার আর সুষম খাদ্য নিশ্চিত করতে ২০২৪ সালে ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় মিল্ক ভিটা গো-খাদ্য কারখানা। মানসম্পন্ন হওয়ায় অল্প সময়ে জনপ্রিয়তা পায় পুষ্টিকর খাদ্য প্রকল্পটি। খাদ্যের গুণগত মান ভালো থাকায় সে সময় প্রতিটি খামারে গরুর স্বাস্থ্য এবং দুধের মাত্রাও বেশ ভালো ছিল। কিন্তু একসময় এটি আর ঠিক থাকেনি।
খামারিদের অভিযোগ, চড়া দামে একটি কোম্পানির গো-খাদ্য কিনতে বাধ্য করেন মিল্ক ভিটা। এই কোম্পানির গো-খাদ্য মানসম্পন্ন না হওয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়ে অনেক গবাদিপশু। দুধ উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। এতে প্রতিবাদ জানালে খামারিদের সাবেক চেয়ারম্যানের রোষানলে পড়তে হয়। ফলে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয় খামারিদের। মিলের ফান্ডে থাকা সাড়ে ৬ কোটি টাকা তিনটি চিঠির মাধ্যমে প্রধান কার্যালয় থেকে উত্তোলন করা হয়। মিল্ক ভিটা কর্তৃপক্ষ বলে, নীতিগত সমস্যা দেখিয়ে মিলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। টেকনিক্যাল তেমন কোনো সমস্যা ছিল না। দুর্নীতির যে বিষয়গুলো আছে সেগুলো তদন্ত করা হচ্ছে।
মিল্ক ভিটাকে আরও উন্নত করতে দুগ্ধজাত পণ্যের প্রসার ঘটাতে এবং দিনে ২ লাখ মিটার তরল দুধকে গুঁড়া দুধে রূপান্তরের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ীতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মেগা প্রকল্প সুপার ইস্টার্ন পাউডার প্ল্যান্ট শুরু করেন তৎকালীন চেয়ারম্যান। ১০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্ল্যান্ট স্থাপন কাজের মেয়াদ ছিল দুই বছর। প্ল্যান্টটির অবকাঠামোগত কাজ ২০১৮ সালে শেষ হলেও এর যন্ত্রাংশ কেনা নিয়ে বাধে বিপত্তি। অভিযোগ ওঠে, জার্মানির পরিবর্তে ভারত থেকে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ কেনা হয়েছে। ২০২৩ সালে প্রাথমিক ট্রায়ালে আগুন ধরে যায় মেশিনে। এরপর থেকে বন্ধ রয়েছে প্ল্যান্টটি। অধিকাংশ যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়ে আছে। মেয়াদ বারবার বাড়িয়েও শেষ পর্যন্ত আট বছরেও প্ল্যান্টটি চালু করতে পারেনি মিল্ক ভিটা কর্তৃপক্ষ।
কাজ সম্পন্ন না করেই তুলে নেওয়া হয়েছে বরাদ্দ অর্থ। ক্রয় কমিটি বলছে, নীতিমালা অনুসরণ করেই তারা এই অর্থ তুলেছেন। তারপরও কোম্পানির অবস্থা শোচনীয়। স্থানীয় খামারিরা বলছেন, বিভিন্ন সময় পরিকল্পিতভাবে অর্থ আত্মসাতের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে মিল্ক ভিটাকে। যে টাকায় দুর্নীতি হয়েছে এই টাকা মিল্ক ভিটায় ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের ঋণ পরিশোধে খরচ করতে হবে। সেই সঙ্গে যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। মিল্ক ভিটার কর্মচারীরা বলছেন, দুই দিনের ট্রায়ালে মেশিনে আগুন ধরে যায়। বর্তমানে প্ল্যান্টটি বন্ধ রয়েছে। এর প্রতিটি যন্ত্রাংশ নিম্নমানের, যে কারণে প্ল্যান্টটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট বলেন, প্ল্যান্টটি এখন ভাঙারি হিসেবে বিক্রি করতে হবে। এর নির্মাণকাজে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে। দুর্নীতিবাজরা ওই অর্থ বিদেশে পাচার করছে। এ কাজটি যারা করেছে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
পুষ্টিকর খাদ্য প্রকল্প এবং সুপার ইস্টার্ন পাউডার প্ল্যান্ট মেগা প্রকল্পটি এভাবে অকেজো হওয়ায় সরকারের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কাজে জড়িত অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। দুটি প্রকল্পে অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি সুস্থ তদন্ত সাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। মিল্ক ভিটা দেশের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান; সেই হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব সবার।