সমতার সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে নারীর প্রতি বিদ্বেষমূলক আচরণ, হিংসাত্মক যাবতীয় কার্যকলাপ দূর এবং ধর্ষণ ও নারী নিপীড়নের সঙ্গে জড়িতদের বিচারসহ ১৩ দফা দাবিতে চতুর্থবারের মতো রাজধানীতে মধ্যরাতে ‘শেকল ভাঙার পদযাত্রা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শুক্রবার (৩০ আগস্ট) রাত ১১টা ৫৯ মিনিটে শাহবাগ থেকে ওই পদযাত্রা শুরু হয়। মশাল মিছিল নিয়ে পদযাত্রাটি সিটি কলেজ-কলাবাগান-মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ হয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে এসে থামে। শনিবার ভোর ৪টা পর্যন্ত এখানে অবস্থান করেন তারা।
পদযাত্রা শেষে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তারা বলেন, ‘নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। নারী-পুরুষের সমানাধিকার এ দেশে কেবল বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ। রাষ্ট্রের ব্যর্থতার কারণে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি এবং নিপীড়ন দেশের প্রতিটি জেলায় নিত্য ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় এসব কর্মকাণ্ডে ক্ষমতাশালীরা জড়িত থাকায় সরকারকে তাদের অপরাধ ধামাচাপা দিতেই ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই অপসংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না।’
অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন বলেন, ‘নারীদের ওপর একের পর এক অন্যায় হয়েই যাচ্ছে। যারা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার আমরা দেখছি না। এখন এসব বন্ধ হওয়া জরুরি।’
সমাবেশে বক্তারা তাদের ১৩ দফা দাবি তুলে ধরেন। সেগুলো হলো- সারা দেশে অব্যাহত ধর্ষণ-যৌন সহিংসতার সঙ্গে যুক্তদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক ও ন্যায্য শাস্তি নিশ্চিত ও শিল্পপতি-ধনকুবেরদের নারী নিপীড়নমূলক অপরাধ বিচারের আওতায় এনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে অন্যায্যভাবে খারিজ হয়ে যাওয়া মামলাগুলো পুনঃতদন্তের ব্যবস্থা; ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ (সংশোধিত) এর ১৪৬ (৩) ধারা পুনঃসংস্কার করার মাধ্যমে আইনের দিকসহ জাতি-ধর্ম-বর্ণ-বয়স-লৈঙ্গিক পরিচয় নির্বিশেষে যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে যেকোনোভাবেই ‘ভিক্টিম ব্লেমিং’ (দোষারোপ করা/নিন্দা জানানো) বন্ধ করতে হবে; আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইনি ও সামাজিকভাবে ধর্ষণের সংজ্ঞায়ন সংস্কার; মামলার ডিএনএ আইনকে সাক্ষ্যপ্রমাণের ক্ষেত্রে কার্যকর করা; সেনা-প্রহরার পাহাড়ে নারীর ওপর সংঘটিত সামরিক-বেসামরিক পুরুষদের যৌন সন্ত্রাসের খবর গণমাধ্যমে আসার অবাধ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, অভিযোগ যথাযথভাবে আমলে নেওয়া ও সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে পাহাড়ে নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ; হাইকোর্টের নির্দেশনানুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি, বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে যৌন নির্যাতনবিরোধী সেল কার্যকর ও পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। সিডো সনদে বাংলাদেশকে স্বাক্ষর ও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন; যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে প্রান্তিক অঞ্চলের নারীদের সুবিধার্থে হটলাইন চালু করতে হবে। গ্রামীণ সালিশ/পঞ্চায়েতের মাধ্যমে ধর্ষণের অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা; প্রাথমিক লেভেল থেকেই পাঠ্যপুস্তকে যৌন শিক্ষা (গুড টাচ-ব্যাড টাচের শিক্ষা, সম্মতি বা কনসেন্টের গুরুত্ব, প্রাইভেট পার্টস সম্পর্কে জানানো) যোগ করার সঙ্গে সঙ্গে এর কার্যকরী পাঠদান নিশ্চিত; মাদ্রাসার শিশুসহ সব শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোনো শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হলে ৯০ দিনের মাঝে দ্রুততম ট্রাইব্যুনালে অভিযোগের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত; কোনো নারী নিপীড়নের শিকার হলে অভিযোগ জানাতে গেলে থানা ও আদালতে পুলিশি ও অন্যান্য হয়রানি বন্ধ; গণপরিবহনে নারীদের সুরক্ষা এবং নিরাপত্তার বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ; ধর্মীয় বক্তব্যের নামে অনলাইনে ও অফলাইনে নারী অবমাননাকর বক্তব্য প্রচার বন্ধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ।
আরিফ জাওয়াদ/এমএ/