ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে হত্যা-নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত থাকায় দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। গত বৃহস্পতিবার ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সঙ্গে বৈঠককালে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ‘আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা নেই’ বলে জানানোর পর থেকে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহর দেওয়া স্ট্যাটাস নানা আলোচনার জন্ম দেয়। সেখানে তিনি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করার অভিযোগ আনেন। তিনি লেখেন, ‘আসুন, সকল যদি কিন্তু পাশে রেখে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। আওয়ামী লীগ রাজনীতি করতে পারলে জুলাই ব্যর্থ হয়ে যাবে। আমাদের শরীরে এক বিন্দু রক্ত থাকা পর্যন্ত শহিদদের রক্ত আমরা বৃথা হতে দেব না। ৫ আগস্টের পরের বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কামব্যাকের আর কোনো সুযোগ নাই বরং আওয়ামী লীগকে অবশ্যই নিষিদ্ধ হতেই হবে।’
একই ইস্যুতে দলটির মুখ্য সমন্বয়কারী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলেও পরবর্তী সময়ে সেটি তিনি মুছে দেন। একই সময়ে বিএনপির মিডিয়া সেল থেকেও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের ‘আওয়ামী লীগ নামে কেউ রাজনীতি করবে পারবে না’ গত ৫ ফেব্রুয়ারি দেওয়া বক্তব্য শেয়ার করা হয়। এরই মধ্যে বিভিন্ন সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে কর্মসূচি পালন করে। গঠন করা হয় ‘আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ মঞ্চ’।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও শুক্রবার (২১ মার্চ) সকালে রাজধানীর উত্তরার দক্ষিণখানে ফায়দাবাদ মধ্যপাড়া হাজি শুকুর আলী মাদ্রাসাসংলগ্ন মাঠে দুস্থদের মধ্যে ঈদসামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানে এ নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়ে কথা হচ্ছে, কিন্তু বিচার নিয়ে কথা হচ্ছে না। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচারের পর আওয়ামী লীগকে জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। আর জনগণ ক্ষমা করলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আওয়ামী লীগের যারা অপরাধী তাদের বিচার নিশ্চিত হওয়ার পর যারা হত্যা-লুটপাটে জড়িত নয়, তাদের যদি জনগণ রাজনীতি করার সুযোগ দেয় আমাদের কিছু বলার নেই।’
আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন জনগণ মেনে নেবে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। গতকাল এক ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, ‘জনগণ অগ্রাধিকার ভিত্তিতেই গণহত্যার বিচার দেখতে চায়। এর বাইরে অন্য কিছু ভাবার কোনো সুযোগ নেই।’
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ও গণহত্যার বিচারের দাবিতে সারা দেশে অবস্থান ও গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করবে গণঅধিকার পরিষদ। গতকাল বিক্ষোভ কর্মসূচিতে এ ঘোষণা দেন দলের সভাপতি নুরুল হক নুর।
গতকাল দলের এক জরুরি সভায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদ বলেন, ‘ইতিহাসের নিকৃষ্ট দল আওয়ামী লীগের বিচারের আগে যারাই পুনর্বাসন চাইবে তাদেরকেই প্রতিহত করা হবে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে আর কোনোভাবেই সুযোগ দেওয়া হবে না।’
জুলাই আন্দোলনে নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রধান উদ্যোক্তা ও সাবেক শিবির নেতা আলী আহসান জোনায়েদ লেখেন, ‘আমি বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ সব রাজনৈতিক দল ও সাধারণ জনগণকে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাই। ছাত্র-জনতা আবারও প্রস্তুত আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের অপচেষ্টা রুখে দিতে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবিতে গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) একাধিক বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের বিচার ও রাজনীতিতে নিষিদ্ধকরণের দাবিতে ‘আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ মঞ্চ’ নামে একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম ঘোষণা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল সাধারণ শিক্ষার্থী।
গতকাল জুমার নামাজ শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে থেকে মিছিল শুরু করেন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের নেতা-কর্মীরা। সেখান থেকে মিছিলটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এসে সমাবেশ করে। এ সময় বক্তারা আওয়ামী লীগ ও নৌকা প্রতীক দ্রুত নিষিদ্ধের দাবি জানান।
সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব জাহিদ আহসান বলেন, ‘বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও নৌকা প্রতীকে কোনো রাজনীতি হবে না।’
সংগঠনটির কেন্দ্রীয় মুখপাত্র আশরেফা খাতুন বলে, ‘আমরা আগস্টে যেভাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ছিলাম, এখনো তেমনই আছি। যতদিন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ না হয়, ততদিন আমরা মাঠে থাকব।’
বেলা সাড়ে ৩টায় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ’র ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলপাড়া থেকে মিছিল নিয়ে এসে রাজু ভাস্কর্যের সামনে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ চেয়ে মিছিল করা হয়েছে। একই দাবিতে ‘আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ মঞ্চ’ নামে একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম ঘোষণা করে।
এই মঞ্চের পক্ষ থেকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘শনিবার (২২ মার্চ) বিকেল ৫টায় রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ ও গণহত্যার বিচারের দাবিতে ইফতার ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করবে এ মঞ্চ।’
গতকাল ‘জুলাই মঞ্চ’ নামে একটি ব্যানারে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। বিকেল থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত অবস্থান করে দেখা গেছে, পাঁচ-ছয়জন তরুণ শাহবাগ মোড়ের ঠিক মাঝখানে বসে স্লোগান দিতে থাকেন।
৭২ ঘণ্টার মধ্যে নিষিদ্ধের দাবি
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, চট্টগ্রামে বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। গতকাল দুপুরে নগরীর নিউ মার্কেট মোড়ে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি ও গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের এ বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। বেলা ২টার দিকে নগরীর আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ থেকে জুমার নামাজের পর বিক্ষোভ মিছিলটি বের করা হয়। মিছিলে জাতীয় নাগরিক পার্টি উত্তরাঞ্চলের কেন্দ্রীয় সংগঠক রাসেল আহমেদ, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ইমন সৈয়দ, গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক খান তালাত মাহমুদ রাফি, যুগ্ম সদস্যসচিব রিজাউর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
রাজশাহীতে নিষিদ্ধের দাবি
রাবি প্রতিনিধি জানান, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) বেশ কিছু শিক্ষার্থী। গতকাল দুপুরে জুমার নামাজের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের প্রধান ফটক দিয়ে নগরীর তালাইমারী এলাকায় সমাবেশে মিলিত হয়। পরে আবার তালাইমারী থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা গেটে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে মিছিলটি শেষ হয়।
সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রাবির অন্যতম সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, আওয়ামী লীগকে বাংলার মাটিতে রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না। আওয়ামী লীগ যদি দেশের রাজনীতিতে ফিরে আসতে চায়, তাহলে দুই হাজার শহিদের প্রাণ ফিরিয়ে দিতে হবে।’
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে কুমিল্লায় বিক্ষোভ মিছিল করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা। গতকাল দুপুরে জুমার নামাজ শেষে নগরীর ঝাউতলা এলাকার ছাতি মসজিদ থেকে কান্দিরপাড় পূবালী চত্বরে এসে মিছিল শেষ হয়। পরে পূবালী চত্বরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা ও মহানগর কমিটির নেতারা।
জীবন দিবো, জুলাই দিবো না
রংপুর প্রতিনিধি জানান, আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গতকাল বেলা আড়াইটায় ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকের সামনে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে শিক্ষার্থীরা মানববন্ধনে অংশ নেন। এ সময় তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন। এই সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মহানগর সদস্যসচিব রহমত আলী, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক শামসুর রহমান সুমন, জাহিদ হাসান জয়, জাকের হোসেন পাশা, আশিক মিয়া প্রমুখ।