যেকোনো দেশে নতুন সরকার যখন দায়িত্বভার গ্রহণ করে তখন তিন মাস বা ১০০ দিনের মাথায় তার সাফল্য-ব্যর্থতার একটা মূল্যায়ন করা হয়। সরকার চমৎকার কোনো কাজ করেছে কিনা, সে ব্যাপারে সবার জানার আগ্রহ থাকে। বিশেষ করে, এ ব্যাপারে মিডিয়ার এক ধরনের কৌতূহল আছে। সরকারের কর্মতৎপরতা কেমন সেটা অনেকেই চিন্তা করে এবং বুঝতে চায়। এর ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতের দিনগুলো কেমন হবে, সে সম্পর্কে আন্দাজ বা অনুমান করতে চায়। বাংলাদেশে ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটা অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। এই সরকারের চরিত্র, ম্যান্ডেট, তার কর্মকাণ্ড সাধারণ সময়ে ইলেকশনের পর যে সরকার গঠিত হয় তার সঙ্গে তুলনা চলে না। এই সরকার যখন দায়িত্বগ্রহণ করে তখন বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিদ্যমান ছিল এবং এখনো আছে আমলাতন্ত্র, পুলিশ, বিচারবিভাগ, বিভিন্ন ধরনের গোয়েন্দা সংস্থা এবং সামরিক বাহিনী। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কথাও ভাবতে হবে। ইউজিসির কথা ভাবতে হবে। এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং যেগুলোর শক্তির ওপরে একটা রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে। বিগত শেখ হাসিনার স্বেচ্ছাচারী এবং ফ্যাসিস্ট সরকার এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছে। প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যেমন- ৫ আগস্টের পর পুলিশ প্রশাসনের সবাই পালিয়ে গেল। মুষ্টিমেয় সদস্য ছাড়া তাদের কোথাও কর্মস্থলে পাওয়া গেল না। পুলিশের ঊধ্বর্তন কর্মকর্তারাও এই আন্দোলনের সময় ছাত্রহত্যা-জনহত্যার জন্য দায়ী- এরকম অনেকেই আছে। সাধারণ যারা পুলিশ অফিসার, তারাও আছে এবং তারা এসব কর্মকাণ্ড করার ফলে তাদের মনোবল সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়েছে। ফলে ডিউটি করতে আসার ব্যাপারে তাদের অনীহা ছিল- শুরুতেই তারা পালিয়েছিল। যাই হোক, সরকার তাদের ফিরিয়ে আসার আহ্বান জানালে একই সঙ্গে অভয় দিলে তাদের একাংশ কাজে যোগ দিয়েছে। যতদূর জানি, অনেক পুলিশ সদস্য এখনো কাজে যোগ দেননি। পুলিশ বাহিনী বিধ্বস্ত হয়েছে। ফলে সাধারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার যে রাস্তা, সেই কাজটা হচ্ছে না। আর হচ্ছে না বলেই নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এর মধ্যে ছিনতাই, রাহাজানি, ডাকাতির মতো ঘটনা ঘটছে।
আমলাতান্ত্রিক হাসিনা সরকার দলীয়করণ করার জন্য তার প্রতি, তার আদর্শের প্রতি, তার রাজনীতির প্রতি কারও শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়নি, যেটা আমরা ইতোমধ্যে দেখতে পেয়েছি। তিনি তার অনুগতদের পদায়ন করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছেন। ফলে এখানে একটা বিরাট সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই দলের লোকেরা এসেছে। প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে এই বিপ্লবের বা এই পরিবর্তনের বিরোধী লোক যারা তারা আছে। এবং তারা সরকারের কাজকে সফল হতে নানারকম সমস্যা অর্থাৎ বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। এটা হচ্ছে আমলাতন্ত্রের ব্যাপার। যেখানে আবার তাদের বাদ দিয়ে নতুন মুখ বসানো, নতুন ব্যক্তিকে সেখানে দায়িত্ব দেওয়া- এটাও একটা বিরাট সমস্যা। এই সমস্যার কিছুটা অর্থাৎ ২০ শতাংশ বা ৩০ শতাংশ তারা পরিবর্তন করতে পেরেছে। কিন্তু পুরাটা এখনো পারেনি। এজন্য সময় লাগবে। ফলে, সব সময় শঙ্কা লেগে থাকে। এই সরকার ইতোমধ্যেই সম্মুখীন হচ্ছে ছোট ছোট বিক্ষোভ, আন্দোলন ইত্যাদি নানারকম অস্থির পরিবেশের। এটা দুই কারণে হচ্ছে- একটা কারণ হলো, এখন মানুষ অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে। গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করছে। আগে, কেউ কথা বলতে, বিক্ষোভ বা রাস্তায় মিছিল করতে পারত না। যেটা বিগত শেখ হাসিনার আমলে ছিল। পাশাপাশি যেটা হচ্ছে, তা হলো এ ধরনের ঘটনার কারণে দেশে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। একই সঙ্গে মানুষ মনে করছে, সরকার মনে হয় ঠিকমতো দেশ চালাতে পারছে না। ব্যাপারটা এমন নয়। আমরা উল্লেখ করতে পারি, যেমন- ঢাকা শহরে সাতটি বড় কলেজের ছাত্ররা আন্দোলন করল। তারা চাইল যে, তাদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় করা হোক। যেহেতু তাদের পরীক্ষা সময়মতো হয় না। ফলাফল ঠিকমতো হয় না বলেই তারা একটা নতুন বিশ্ববিদ্যালয় চায়। তারা এখন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে সেই বিশ্ববিদ্যাল কাজ শুরু করবে কয়েক বছর পর। সুতরাং, এই দাবিগুলো উঠেছে দাবির যথার্থতা বিচার না করেই। এ ছাড়া আমরা দেখলাম আনসারদের একটা দল, তারা গোলোযোগ সৃষ্টি করল। এরকম উল্লেখ করলে ছোট ছোট বহু ঘটনা আছে যা ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা। যেমন- গার্মেন্টশিল্পে অশান্তি লেগেই আছে। এই সরকার নিষ্ঠুর আচরণ করতে চায় না বলেই এই আন্দোলনগুলো হচ্ছে। এটার প্রভাব সমাজের বিভিন্ন স্তরে, দেশের বিভিন্ন স্থানে হচ্ছে। তার পরও এই সরকার যে কাজগুলো করেছে বা করছে, তার ফলে মোটামুটি এবং ধীরে ধীরে প্রশাসনব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এই ১০০ দিনে আমরা সরকারের কাছ থেকে অন্তত নতুন ধরনের কোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সহসা আশা করি না। আমরা যেটা আশা করি, সেটা হচ্ছে, একটা রাষ্ট্র আছে, রাষ্ট্রযন্ত্র অ্যাটাক্ট করতে শুরু করেছে। এটাই হলো সরকারের সাফল্য। তারা অ্যাটাক্ট করতে শুরু করেছে। মাঝে মাঝে তারা সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করে। আমি জানি, বিগত সরকারের উচ্চতর পদে যারা আসীন ছিলেন তাদের অনেকের পলায়ন করেছেন। পদগুলো শূন্য হয়ে পড়ে আছে। এমনিতে বাহ্যিকভাবে মনে হয় সরকারের গতিটা খুবই ধীর। এই গতিটা বাড়ানো দরকার। গতিটা বাড়াতে পারলে কাজের গতিও অনেক বাড়বে এবং কর্মকাণ্ড ভালোভাবে হবে। এ ছাড়া দু-তিনটি মন্ত্রণালয় তারা বেশ ভালো করছে তাদের কাজকর্মের ক্ষেত্রে। যেমন- এনার্জি সেন্টারে ভালো হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা আসার যে লক্ষণ সেগুলো ভালোই দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স এখন ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠাচ্ছে বলে আমাদের রেমিট্যান্সের পরিমাণও বাড়ছে। এর ফলে রিজার্ভের যে সংকট ছিল সেটা কিছুটা হলেও কেটেছে। সামনে যদি এই ধারাটা অব্যাহত থাকে, আশা করা যায় আগামীতে পরিস্থিতি আরও ভালো হবে। বিশেষ করে ফরেন রিজার্ভ মসৃণ হবে। দ্রব্যমূল্য বা যেসব সমস্যা দিন দিন প্রকটভাবে দেখা দিচ্ছে, এই সমস্যার শুরু তো বর্তমান সরকারের আমলে হয়নি। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ঊর্ধ্বমুখী দাম আওয়ামী লীগের আমল থেকেই শুরু হয়েছে। চার-পাঁচ বছর ধরেই এই মূল্যস্ফীতির ব্যাপারটা ঘটছে। আশা করি, তারা এদিকে নজর দেবেন। বিশেষ করে বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ যাতে ভালো থাকে সেটার জন্য তারা যেসব ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব সেগুলো নেবে- এটাই দেশের সাধারণ মানুষের চাওয়া।
সরকারের কিছু কিছু সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। যেমন- সম্প্রতি যাদের উপদেষ্টা হিসেবে নেওয়া হলো তাদের নিয়ে নানারকম কথাবার্থা হচ্ছে। বিশেষ করে দুজন উপদেষ্টা সম্পর্কে যথেষ্ট আপত্তি গণমাধ্যমে দেখা গেছে। এই অভিযোগগুলো একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। সরকারকে এজন্য সাবধান হতে হবে। কাকে কী দায়িত্ব দিচ্ছে, কেমন ধরনের লোককে দায়িত্ব দিচ্ছে, তার সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অনুভূতিটা কেমন? সাধারণ মানুষ বিষয়গুলো কী চোখে দেখছে। এগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করা উচিত। উপদেষ্টা পরিষদ যে দায়িত্ব নিয়েছে তা সংস্কার করা প্রয়োজন। একটা ভালো নির্বাচন করতে গেলেও যে সংস্কারগুলো তারা করতে চায়, এ সংস্কারগুলো করা প্রয়োজন। সংস্কারমূলক কাজের জন্য যে কমিশনগুলো গঠিত হয়েছে তারা কাজকর্ম শুরু করেছে, আমরা আশা করব, এগুলো খুব দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হবে। একই সঙ্গে একটা নির্বাচন সামনে হবে। সেই নির্বাচনের আগেই যদি সংস্কারগুলো হয়ে যায় তাহলে নির্বাচন সুষ্ঠু ও ভালো হবে। অন্তর্বর্তী সরকার মানেই হচ্ছে খুব বেশি সময় তারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকবে না। তারা একটা নিরপেক্ষ নির্বাচন করবে। নির্বাচিত সরকারকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে যাবে। তারও আগে সংস্কারের মাধ্যমে একটা স্থিতিশীল রাষ্ট্র কাঠামো তৈরি করবে- এটাই হচ্ছে তাদের সম্পর্কে আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক