১৮০ দিন সময় নির্ধারণ করে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই গত বুধবার মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রশাসনযন্ত্রকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, পরিকল্পনা শুধু কাগজে নয়, মাঠেও ফল চাই। সেই আলোকে সচিবালয়জুড়ে এখন দৃশ্যমান তৎপরতা। অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করে দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে।
সরকারের এই বিশেষ কর্মসূচিতে প্রাধান্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা ও সুশাসন জোরদার, বিদ্যুৎ-জ্বালানিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি জনসেবামুখী খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি। তা ছাড়া প্রশাসনে জবাবদিহি ও গতি বাড়াতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা করা হয়েছে। বিএনপির রাজনৈতিক ইশতেহার বাস্তবায়নে কোনো শৈথিল্য বরদাশত করা হবে না, মন্ত্রী ও সচিবদের প্রতি এমন কঠোর বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে। পুলিশ, র্যাব ও বিজিবিসহ সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি সম্প্রসারণ এবং জেলা-উপজেলায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মাদক ও সাইবার অপরাধ দমনে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের বিষয়ও আলোচনা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ১৮০ দিনের মধ্যে অন্তত কিছু বিষয়ে দৃশ্যমান উন্নতি দেখানোই লক্ষ্য। চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করে দ্রুত সম্পন্নযোগ্য উদ্যোগের বিষয়ে অগ্রাধিকার দিচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করছে। জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়া সহজীকরণ, গ্যাস সরবরাহে অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বিদ্যমান যেসব প্রকল্প ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে, সেগুলো দ্রুত শেষ করে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি সরবরাহ চেইন ও বিলিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর ওপরও জোর দিচ্ছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
জনমুখী খাতে ফল দেখাতে কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সমন্বিত উদ্যোগ নিচ্ছে। কৃষিতে খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রণোদনা প্যাকেজ এবং সরাসরি বাজারসংযোগ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনার সঙ্গে সঙ্গে বীজ, সার ও সেচ সহায়তা সময়মতো বিতরণে জেলা প্রশাসনকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা খাতে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, শিক্ষকের শূন্যপদ পূরণ এবং ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতে জেলা-উপজেলায় চিকিৎসক উপস্থিতি নিশ্চিত, ওষুধ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় মনিটরিং জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভূমি ও খাদ্য, দুই খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। ভূমি মন্ত্রণালয় পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন, অনলাইন সেবা সম্প্রসারণ ও মাঠপর্যায়ে হয়রানি রোধে সময়সীমাভিত্তিক রোডম্যাপ তৈরি করছে। নামজারি নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা, অভিযোগের অনলাইন ট্র্যাকিং এবং ভূমি অফিসে সিসিটিভি নজরদারি জোরদারের প্রস্তাব রয়েছে। কর্মসম্পাদন মূল্যায়নে (এপিএ) নতুন সূচক যুক্ত করে সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়, চাল-গমের সরকারি মজুত বৃদ্ধি, সংগ্রহ অভিযান জোরদার এবং ওএমএস-ভিজিএফসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সরবরাহ নিশ্চিতের পরিকল্পনা করছে। গুদাম আধুনিকীকরণ, ডিজিটাল স্টক মনিটরিং ও জেলা পর্যায়ে সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রেখে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য।
সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আবদুস সবুর মনে করেন, ১৮০ দিনের কর্মসূচি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। তবে সফলতা নির্ভর করবে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় ও কার্যকর মনিটরিংয়ের ওপর। কেবল শাস্তিমূলক জবাবদিহি নয়, প্রণোদনাভিত্তিক মূল্যায়নও প্রয়োজন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি এলে সরকারের ভাবমূর্তি শক্তিশালী হবে এমনটাই মনে করেন জনপ্রশাসনের এই অভিজ্ঞ আমলা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে ধারাবাহিক বৈঠক করে মন্ত্রী-সচিবদের সময়সীমাভিত্তিক অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আলাদা মনিটরিং সেল গঠনের আলোচনা চলছে। কর্মসম্পাদন চুক্তি (এপিএ) পুনর্মূল্যায়নের কথাও শোনা যাচ্ছে। সরকারের সুস্পষ্ট বার্তা– অবহেলা বরদাশত করা হবে না।