৮ মাস আগে ওয়ানডে বিশ্বকাপ মহারণে মুখোমুখি হয়েছিল ভারত-পাকিস্তান। আহমেদাবাদে অনুষ্ঠিত ওই ম্যাচে বাবর, রিজওয়ানদের পাকিস্তানকে ৭ উইকেটের বড় ব্যবধানে হারায় রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলিরা। দুই দলের সমর্থকদের মাঝে অম্ল-মধুর জ্বলজ্বলে স্মৃতি হয়ে আছে ম্যাচটি। আহমেদাবাদ ম্যাচ বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়ার আগে আবারও বিশ্বমঞ্চে মুখোমুখি ভারত-পাকিস্তান। নিউইয়র্কের নাসাউ কাউন্টি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আজ মাঠে নামছে তারা। তবে এবার ওয়ানডে নয়, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে। বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ৮টায় শুরু হবে ম্যাচটি। মার্কিন মুলুকে দুই চিরশত্রুর এই লড়াই দেখতে মুখিয়ে পুরো ক্রিকেটবিশ্ব।
ভারত-পাকিস্তান লড়াই আর দশটা সাধারণ ক্রিকেট ম্যাচের মতো নয়। এর মাঝে লুকিয়ে আছে দুই দেশের বহু বছরের পুরোনো রাজনৈতিক বৈরিতা। যদিও ক্রিকেটারদের শরীরী ভাষায় আগের সেই ঝাঁজ চোখে পড়ে না। গেল কয়েক বছর ধরে ক্রিকেটে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পাওয়া ভারতের একপেশে জয়- দুই দলের রাজনৈতিক বৈরিতাকে অনেকটাই পেছনে ফেলে দিয়েছে। ভারতের সামনে পাকিস্তান এখন নখদন্তহীন আহত বাঘ। যে শুধু তর্জন-গর্জনই করতে পারে, শিকারকে নিজের বশে আনতে পারে না। একসময় নিয়মিত ছিল দুই দলের আইসিসি প্রবর্তিত দ্বিপক্ষীয় সিরিজ। সেটা গত এক দশক ধরে ফাইলবন্দি। ভারত-পাকিস্তানের দেখা হয় এখন বিশ্বকাপের মঞ্চে নতুবা এশিয়া কাপ টুর্নামেন্টে। এই দুই আসরে আবার ভারতের সামনে দাঁড়াতেই পারে না পাকিস্তান।
বিশ্বকাপে বরাবরই সমীহ জাগানিয়া একটি দল ভারত। ফেবারিট হিসেবে প্রায় প্রতিটি আসরে অংশ নেয় তারা। চলমান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও এর ব্যতিক্রম নয়। ২০২৪ ওয়েস্ট ইন্ডিজ-যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে ‘এ’-গ্রুপ থেকে লড়ছে রোহিত শর্মারা। একই গ্রুপে পাকিস্তান ছাড়াও আয়ারল্যান্ড, কানাডা এবং স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে। আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয় দিয়ে আসর শুরু করেছে ভারত। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সুপার ওভারে ম্যাচ হেরে কোণঠাসা পাকিস্তান। আসরের সুপার এইটের স্বপ্ন জিইয়ে রাখতে হলে আজ ভারতের বিরুদ্ধে জয়ের বিকল্প নেই বাবর আজমদের। আইরিশদের বিরুদ্ধে পাওয়া জয়ে রোহিত, কোহলিরা উজ্জীবিত থাকলেও সুপার এইটের হিসাব-নিকাশ তাদের পরিকল্পনাতেও রয়েছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হেরে গেলে রোহিতদের জন্যও সুপার এইট পর্ব কঠিন হয়ে যাবে। তাই আজ ভারত-পাকিস্তান বাঁচা-মরার ম্যাচটি সত্যিকার অর্থে মহারণে রূপ নিয়েছে। তবে পাকিস্তানের চেয়ে কিছুটা হলেও স্বস্তিতে আছে ভারত। সেটা ওই আইরিশদের বিরুদ্ধে পাওয়া জয়ে।
বৈরী দুই প্রতিবেশীর ক্রিকেট ইতিহাস বেশ পুরোনো। টেস্ট এবং ওয়ানডে ক্রিকেট আলোচনার আগে চোখ বুলানো যাক টি-টোয়েন্টিতে। ২০০৫ সালে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের যাত্রা। ভারত-পাকিস্তানের প্রথম দেখা ২০০৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের প্রথম বিশ্বকাপে। ওই আসরে দুদল দুবার পরস্পরের মুখোমুখি হয়। গ্রুপ পর্বের ম্যাচটি টাই হয়। পরে বোল-আউটে ম্যাচ জেতে ভারত। এরপর ফাইনালে আবারও দেখা হয় ভারত-পাকিস্তানের। সেখানে চির প্রতিদ্বন্দ্বীদের হারিয়ে প্রথম আসরে চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত। এরপর বিশ্বকাপে আরও ৬ বার দেখা হয় দল দুটির।
২০১২ ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের জয় ৮ উইকেটের ব্যবধানে। ২০১৪ বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ভারতের জয় ৭ উইকেটের ব্যবধানে, ২০১৬ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে আবারও হার পাকিস্তানের। এবার হারের ব্যবধান ৬ উইকেটে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের সবশেষ জয় ২০২২ অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপে। সেবার ভারত জেতে ৪ উইকেটের ব্যবধানে। ছোট ফরম্যাটের বিশ্বকাপে পাকিস্তানের সাফল্য যে একবারের নেই তা নয়। ২০২১ দুবাই বিশ্বকাপে ভারতকে ১০ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে পাকিস্তান। দুদলের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেট ইতিহাসে এটাই ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় জয়। পরিসংখ্যান যা বলছে, তাতে দুদল টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছে মোট ১২টি। তাতে ভারতের ৮ জয়ের বিপরীতে পাকিস্তানের জয় তিনটিতে। দুদলের খেলা একটি ম্যাচ টাই হয়েছে। বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয়েছে দুদল ৮ বার। তাতে ৭ জয় ভারতের, পাকিস্তানের একটিতে।
ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেট লড়াইয়ের শুরুটা দেশ ভাগের ঠিক পর পরই। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে জন্ম হয় নতুন দেশ ভারত এবং পাকিস্তানের। বছর পাঁচেক পর ক্রিকেট ময়দানে মুখোমুখি হয় তারা। ১৯৫২ সালে দুদলের লড়াইয়ের শুরুটা সাদাপোশাকে টেস্ট ক্রিকেট দিয়ে। ওয়ানডেতে বৈরী দুদলের শুরু ১৯৭৮ সালে। ভারত-পাকিস্তান রাজনৈতিক যুদ্ধে বহুবার সমঝোতার প্রস্তাব নিয়ে; দুদলের বৈরিতা দূরীকরণে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখতে দেখা গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। কখনো ভারত আবার কখনো পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব সেরেছেন মার্কিন কর্তারা। আটলান্টিকের ওপার থেকে ভারতবর্ষে মাতব্বরের ভূমিকা পালন করা দেশেই আজ যুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছে ভারত-পাকিস্তান। অস্ত্র-ট্যাংক গোলবারুদ নিয়ে নয়, ব্যাট-বল হাতে। ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেটযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রও থাকছে। কাকতালীয়ভাবে একই গ্রুপে পড়েছে তিন দল। তবে ম্যাচে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা না থাকলেও একটা স্বার্থ ঠিকই আছে। টানা দুই ম্যাচ জিতে এই মুহূর্তে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে রয়েছে মার্কিনিরা। আজ ভারত জিতলে শীর্ষে ওঠার দারুণ সম্ভাবনা থাকছে রোহিতদের। হেরে গেলে পাকিস্তানের মতো ভারতও পেছনে পড়ে থাকবে। এমনটা হলে নিশ্চয়ই খুশি হবেন মার্কিন সমর্থকরা!
দুই বছর অপেক্ষা শেষে ছোট ফরম্যাটের টি-টোয়েন্টির লড়াইয়ে আজ আবারও মুখোমুখি হচ্ছে ভারত এবং পাকিস্তান। দুই দলের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কে জেতে, হারের তেতো স্বাদই বা কে গ্রহণ করে, সেদিকেই দৃষ্টি এখন পুরো ক্রিকেটবিশ্বের।