এক সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল ভারতবর্ষ। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয় ভারতবর্ষে। দুটি দেশ স্বাধীনতা লাভ করে ভারত ও পাকিস্তান। পরে পাকিস্তান থেকে বের হয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ।
এই উপমহাদেশে অনেক কিছুই ব্রিটিশ শাসনামলের তৈরি। তার অধিকাংশই পড়েছে আবার ভারতে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় অনেক জায়গাতে এসেছে পরিবর্তন। কিন্তু সব জায়গাতেই সেই পরিবর্তন সম্ভব হয়নি। তেমনই একটি কানপুরের গ্রিন পার্ক স্টেডিয়াম। সেই ১৯৪৫ সালে নির্মিত হয় ৪৫ হাজার আসনবিশিষ্ট স্টেডিয়াম, যেখানে প্রথম টেস্ট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫২ সালে।
কানপুরের চেয়েও ভারতে পুরোনো অনেক ভেন্যু আছে। সেগুলোকে যতটা সম্ভব আধুনিকায়ন করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চেন্নাই চিদাম্বরম স্টেডিয়ামের কথা। এই ভেন্যু নির্মিত হয়েছে কানপুরেরও আগে। সেটিকে যথেষ্ট আধুনিকায়ন করা হয়েছে। কিন্তু কানপুর স্টেডিয়ামে রয়ে গেছে সেই ব্রিটিশ ছোঁয়াই।
স্টেডিয়ামের বাইরে দেখে যেমন বোঝা যায় এটি একটি অনেক পুরোনো নির্মাণ, তেমনি ভেতরে প্রবেশ করার পরও। এক একটি সিঁড়ি বেশ উঁচু। দেখেই মনে হবে মোগল আমলের কোনো স্থাপত্য। দুই একটি জায়গা ব্যতীত লিফটের ব্যবস্থা নেই। বয়স্ক, স্বাস্থ্যবান বা কোমরে-হাঁটুতে যাদের ব্যথা আছে, তাদের জন্য সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠা খুবই কষ্টকর। প্রেসবক্সের দিকে তাকালে পুরোনোটা খুব বেশি করে ফুটে ওঠে, যা এই যুগে বিরল। টেবিল জরাজীর্ণ। চেয়ার ডেকোরেটর থেকে ভাড়া করে আনা প্লাস্টিকের। প্রেসবক্সের স্কোরার দুই জনের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে ডেকোরেট থেকে চেয়ার-টেবিল এনে। প্রচণ্ড গরম থেকে রক্ষা পেতে স্ট্যান্ড ফ্যান লাগানো হয়েছে। যে গরম, তাতে করে এই স্ট্যান্ড ফ্যানে নিবারণ সম্ভব নয়। তাই রাখা হয়েছে কয়েকটি এয়ারকুলার। উঁচু উঁচু সিঁড়ি বেয়ে শ্রমিকরা বিশাল সাইজের এক একটি এয়ারকুরার যখন তৃতীয় তলায় নিয়ে আসেন, তখন তাদের পরিশ্রম ছিল খুব বেশি। টেলিভিশন লাগানো হয়েছে মান্ধাতার আমলের মতো করে সামনের গ্রিলে দড়ি দিয়ে বেঁধে। বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাও ত্রুটিপূর্ণ ছিল। টেস্টের আগের দিন এসব লাগানোর ব্যবস্থা করা হয়।
ভারতের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর মাঝে একটি হলো কানপুর। এই সময়ে একটি আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের অন্যতম হলো জায়ান্ট স্ক্রিন। কিন্তু কানপুর স্টেডিয়ামে সেটিও নেই। অস্থায়ীভাবে টেস্টের জন্য দুটি জায়ান্ট স্ক্রিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুই পাশের গ্যালারি নিচের দিকে লাগানো হয়েছে। কিন্তু তা স্টেডিয়ামের সবার পক্ষে দেখা সম্ভব নয়। ফ্লাড লাইটও নিচু। পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। বৃষ্টির পর ২২ গজে খেলা শুরু হতে খুব একটা সমস্যা হয় না। সুপার সুপার দিয়ে দ্রুতই মাঠকে খেলার উপযোগী করে তোলা হয়। কিন্তু বাইরে প্রচুর পানি জমে যায়। যেখান দিয়ে হাঁটা-চলা করা সম্ভব হয়ে উঠে না। প্রেসবক্সের এক পাশে দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে, যেখানে বসে কিছু সাংবাদিক খেলা কভার করছিলেন। কিন্তু বৃষ্টি আসার পর তাদের সেখান থেকে উঠে যেতে হয়েছে। সব মিলিয়ে আধুনিক জমানার জন্য এই স্টেডিয়াম বেমানান হলেও ধরে রেখেছে যেন নিজেদের ঐতিহ্য। যেমনটি তারা ধরে রেখেছে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট একটি গ্যালারি রেখে। ভারতের আর কোনো স্টেডিয়ামে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য এ রকম সুবিধা নেই। গতকাল প্রথম দিন দেখা গেছে, সেই গ্যালারিতে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা বসে খেলা দেখছেন।
কানপুর স্টেডিয়ামের নাম গ্রিন পার্ক হওয়ার পেছনেও রয়েছে ছোট্ট এক কাহিনি। গ্রিন নামে এক ব্রিটিশ রমণী সেখানে যেতেন ঘোড়া দৌড়ানোর জন্য। তারপর তার নামেই নামকরণ করা হয় এই স্টেডিয়ামের। এই স্টেডিয়ামের পাশেই রয়েছে গঙ্গা নদী।
উত্তর প্রদেশের এই ভেন্যুতে সব সময় খেলা হয় না। আধুনিকায়ন না করাতে বিসিসিআই ভেন্যু বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কানপুরকে অনেক পেছনের সারিতে রাখে। যে কারণে লম্বা বিরতি দিয়ে পায় এক একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। নির্মাণ সাল থেকে হিসেব করলে এই ভেন্যুর বয়স ৭৯ বছর। আর প্রথম টেস্ট থেকে হিসেব করলে ৭২ বছর। দীর্ঘ এই পথ পরিক্রমায় বাংলাদেশ-ভারতের চলমান টেস্ট হচ্ছে ২৪তম। ওয়ানডে অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৫টি আর টি-টোয়েন্টি ম্যাচ মাত্র একটি। আইসিসির আসরে ম্যাচও পায় না। এখন পর্যন্ত ভারতে আইসিসির বেশ কয়েকটি আসর বসেছে, সেখানে কানপুর ১৯৯৬ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপে একবার মাত্র একটি ম্যাচ পেয়েছিল। ভারত ও জিম্বাবুয়ের মাঝে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেই ম্যাচ।