আয়োজক ভারত, অথচ পাকিস্তান দল সেখানে যাবে না বলে আয়োজন সরিয়ে নেওয়া হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। তবুও দুই দলের ম্যাচ হচ্ছে। গ্রুপ পর্বে একবার, সুপার ফোরে আবার, এমনকি ফাইনালেও দেখা হতে পারে। তাহলে প্রশ্ন আসে, এতবার মুখোমুখি হলে এটিকে আর ‘দুর্ঘটনাজনিত দেখা হওয়া’ বলা চলে কি?
ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ মানেই আবেগ-উত্তেজনার বহুমাত্রিক স্ফুলিঙ্গ। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ের বাইরেও এই ম্যাচগুলো ঘিরে রয়েছে দ্বিমুখী অবস্থান, প্রশ্নবিদ্ধ নীতিনির্ধারণ। বছরের পর বছর দ্বিপক্ষীয় সিরিজে মুখ না দেখানো দুই দল আবার টুর্নামেন্টে পরিণত হয় ‘অপরিহার্য জুটি’তে। দ্বিপক্ষীয় সিরিজ বন্ধ থাকলেও বিশ্বমঞ্চে তাদের দেখা হতেই হবে। এই ‘বাধ্যতা’ নিয়েই কিছুদিন আগে প্রশ্ন তুলেছিলেন মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন।
সাবেক এই ভারতীয় অধিনায়ক সরাসরি বলেন, ‘যদি রাজনৈতিক কারণে সিরিজ না হয়, তাহলে টুর্নামেন্টে মুখোমুখি হওয়ার যৌক্তিকতা কোথায়?’ আজহারের এই জিজ্ঞাসা শুধু বিসিসিআই নয়, আইসিসি, এসিসি এবং বিশ্ব ক্রিকেট ব্যবস্থার একটি বিবেকের আয়না হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় এশিয়া কাপের এবারের আসর তার বড় উদাহরণ। আয়োজক ভারত, অথচ পাকিস্তান দল সেখানে যাবে না বলে আয়োজন সরিয়ে নেওয়া হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। তবুও দুই দলের ম্যাচ হচ্ছে। গ্রুপ পর্বে একবার, সুপার ফোরে আবার, এমনকি ফাইনালেও দেখা হতে পারে। তাহলে প্রশ্ন আসে, এতবার মুখোমুখি হলে এটিকে আর ‘দুর্ঘটনাজনিত দেখা হওয়া’ বলা চলে কি?
ক্রিকেটবোদ্ধারা জানেন, ভারতের সাবেক আরেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলীর অবস্থান একসময় ছিল ঠিক উল্টো দিকে। গত এপ্রিলে পেহেলগামের সন্ত্রাসী হামলার পর তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা পুরোপুরি বন্ধের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু এখন তার কণ্ঠে শোনা যায় সম্প্রীতির বার্তা, ‘সন্ত্রাস নয়, খেলা চলুক।’
এই বিপরীত অবস্থানগুলোই বলে দেয়, ভারতীয় ক্রিকেট মহলই পাকিস্তান নিয়ে দ্বিধায় বিভক্ত। কেউ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কথা বলেন, কেউ সম্পর্কের সেতুবন্ধনের। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়। যদি সিরিজে না খেলাই রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত হয়, তবে আইসিসির টুর্নামেন্টে মুখোমুখি হওয়ার অর্থ কী?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আর্থিক পরিসংখ্যানে। ২০১৯ বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ দেখেছে প্রায় ১১০ কোটি মানুষ, যা ফাইনালের চেয়েও বেশি। বিজ্ঞাপনদাতা, সম্প্রচার সংস্থা এবং ক্রিকেট বোর্ডগুলোর কাছে এটি কেবল খেলা নয়, ‘টাকার খনি’।
তাই দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ড মুখে যতই বলুক ‘খেলব না’, বাস্তবে তারা আবারও মুখোমুখি হয়। কারণ না খেললে হারাবে কোটি কোটি ডলারের রেভিনিউ। আর এখানেই তৈরি হয় এক অস্বস্তিকর দ্বিমুখিতা। জাতীয় স্বার্থ বনাম আর্থিক স্বার্থ।
বাবর আজম বনাম রোহিত শর্মা, শাহীন আফ্রিদি বনাম সূর্যকুমার, এই দ্বৈরথগুলো এখন আর শুধু ক্রীড়া নয়, এগুলো হয়ে উঠেছে স্মারক, স্মৃতি আর মিডিয়া বাজারের প্রতীক। কিন্তু যখন এই লড়াইয়ের পেছনে থাকে রাজনৈতিক অস্বীকৃতি, তখন খেলা আর খেলা থাকে না। তখন তা হয়ে দাঁড়ায় একটি প্রজন্মের বিভ্রান্তি।
আজহারউদ্দিনের প্রশ্ন তাই কেবল একটি মন্তব্য নয়, এটি একটি দলিল। আমরা কি সত্যিই একটি সুস্থ, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ক্রিকেট চাই? নাকি চাই শুধু ‘নির্বাচিত উত্তেজনার বাজার’?
উপমহাদেশের ক্রিকেট সম্পর্ক কী শুধু মাঠেই গড়ে উঠবে, নাকি এর পেছনের মুখোশও একদিন খসে পড়বে?