তাবাসসুম অর্জিতার (ছদ্মনাম) বয়স ১৫ বছর। ইদানীং বারবার আয়নায় নিজেকে খুঁটিয়ে দেখে সে। কিন্তু স্বাস্থ্য মোটা হওয়ার কারণে প্রতিবারই হতাশ ও বিষণ্ন হয়। তার মতো মাহিদও (ছদ্মনাম) ভুগছে একই সমস্যায়। স্কুলে বন্ধুরা মাহিদের স্থূলতার কারণে প্রায়ই তাকে নিয়ে মজার ছলে ঠাট্টা, কটূক্তি করে। কিশোর বয়সে অতিরিক্ত ওজন শুধু শারীরিক সমস্যারই কারণ নয়। বরং তৈরি করে নানা মানসিক বাধাও। এ সময় ছেলেমেয়েরা নিজেদের সৌন্দর্য নিয়ে বেশি ভাবে। স্বাস্থ্য বেশি হলে অনেক সময় দুশ্চিন্তা, বিষণ্নতা, হীনম্মন্যতা দেখা দেয়। অনেকে তখন দ্রুত ওজন কমাতে খাওয়াই বন্ধ করে দেয়। এতে শারীরিক দুর্বলতা ও বয়ঃসন্ধিকালীন পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হয়। টিনএজ বয়সে ডায়েট কেমন হবে জানিয়েছেন পুষ্টিবিদ মালিহা পারভীন
ওজন বাড়ার কারণ
শৈশব থেকে কৈশোরে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে নানা পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। কিন্তু সেই সঙ্গে হঠাৎ ছেলেমেয়েদের ওজনও কেন বৃদ্ধি পায়? এর অন্যতম কারণ হলো এ সময় শরীরে ঘটে যাওয়া হরমোনাল ও পাকস্থলীর পরিবর্তন। টিনএজ বয়সে শরীরে ইনসুলিন, ইস্ট্রোজেন, টেস্টোস্টেরন, স্টেরয়েড ও গ্রোথ হরমোনের বিকাশ অনেক সময় ওজন বৃদ্ধি করে। আবার শৈশবের চেয়ে কৈশোরে এসে পাকস্থলীর মেটাবলিজম ক্ষমতা কিছুটা কমে যায়। এতে শুরুর দিকে খাবার হজমে সমস্যা হয় এবং ওজন বাড়তে পারে।
টিনএজে ওজন বাড়ার আরেকটি বড় কারণ ফাস্টফুড, কোমল পানীয় এবং মিষ্টি জাতীয় খাবার বেশি খাওয়া। সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও কিশোর-কিশোরীদের কাছে আইসক্রিম, চকলেট, জাংকফুড বেশ জনপ্রিয়। তবে মজাদার এসব খাবার কিন্তু মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়! উচ্চ ক্যালরিযুক্ত এসব খাবার কোনোরকম খাদ্য গুণাগুণ ছাড়াই বাড়িয়ে তোলে কিশোর-কিশোরীদের ওজন। আবার বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে মোবাইল, কম্পিউটার, ভিডিও গেমসে বেশি সময় কাটানো ছেলেমেয়েরা সমবয়সীদের তুলনায় বেশি মোটা হয়। নড়াচড়া না করা, অনিয়মিত ঘুম, জীবনযাপনও ওজন বাড়ায়।
শরীরে যেসব প্রভাব পড়ে
অনেকের ধারণা, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এসব সমস্যায় শুধু বড়রাই ভোগেন। আসলে তা নয়, টিনএজ বয়সে শরীরে অতিরিক্ত মেদ জমে গেলে শুধু ওজনই বাড়ে না। পাশাপাশি হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। মেটাবলিক সমস্যার কারণে কিশোর-কিশোরীদের দেখা দিতে পারে টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগ। এ ছাড়া পেটে অতিরিক্ত মেদ জমলে খাবার হজমেও হজমেও সমস্যা হয়। আবার ওজন বাড়ার কারণে কিশোর-কিশোরীরা মানসিক চাপে ভোগেন। অনেক সময় নিজের বাহ্যিক গঠনের কারণে আত্মবিশ্বাস কমে যায়।
কেমন হবে ডায়েট
শরীরে ওজন বেড়ে গেলে সুস্থতা ও সৌন্দর্য রক্ষায় ডায়েট তো করবেই। তবে পরিণত নারী-পুরুষের থেকে কিশোর-কিশোরীদের ডায়েট অনেকটাই আলাদা। তাই অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। বড়দের ডায়েট সাধারণত স্বাস্থ্য বজায় রাখা বা ওজন কমানোর উদ্দেশ্যে হয়। কিন্তু টিনএজারদের ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন। এই বয়সে শরীর বাড়ে, মস্তিষ্ক বিকশিত হয়। তাই ডায়েটটা হতে হবে এমন, যাতে শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়। এ সময় হঠাৎ করেই শারীরিক, মানসিক ও হরমোনাল ক্রিয়া বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত ক্যালরির প্রয়োজন হয়। কিশোর বয়সে ছেলেদের দৈনিক ২৫০০ ক্যালরি ও মেয়েদের ২০০০ ক্যালোরি খাবার প্রয়োজন। তাই স্বাস্থ্য বেশি হলেও চাইলেই খাবারের পরিমাণ বেশি কমানো যাবে না। বরং টিনএজারদের সময় নিয়ে আস্তে আস্তেই ওজন কমাতে হবে।ডায়েটে গুরুত্ব দিতে হবে প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বি জাতীয় খাবার। কারণ, কিশোর-কিশোরীদের হাড় ও মাংসপেশির গঠন, উচ্চতা বৃদ্ধি ও মস্তিষ্ক বিকাশের জন্য প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি প্রয়োজন। তাই দুধ, ডিম, মাছ, মাংস, ডাল, বাদাম রাখতে হবে প্রতিদিনের ডায়েট চার্টে।
অতিরিক্ত ওজন ও স্বাস্থ্য কমাতে বাদ দিতে হবে ফাস্টফুড ও বাইরের প্রক্রিয়াজাত খাবার। তোমাদের অনেকের জন্যই হয়তো এ কাজ খানিকটা কঠিন। তাহলে মাসের দু-এক দিন নির্ধারণ করতে পার পছন্দের জাংকফুডের জন্য। তবে স্কুল থেকে ফেরার পথে, বন্ধুদের আড্ডায় হুটহাট ফাস্টফুড খাওয়ার বায়না ধরা কিন্তু চলবে না। কিশোর-কিশোরীর বিকাশে পর্যাপ্ত খাবার গ্রহণ করা প্রয়োজন। তাই খাবার তালিকা ছোট করার বদলে জোর দিতে হবে নিয়মিত ঘুম ও শরীর চর্চায়। ঘুম ও শরীর চর্চার সঙ্গে রয়েছে টিনএজ ডায়েটের নিবিড় সম্পর্ক। নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম খাবার হজমে, মানসিক প্রশান্তি ও হরমোনাল কার্যকলাপ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। এতে করে ওজন বাড়ে না।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ডায়েট আছে। তবে কিটো, ফাস্টিং, ওমাডের মতো ডায়েটগুলো আসলে বড়দের জন্য উপযুক্ত। অনেক সময় কিশোর-কিশোরীরা কৌতূহলবশত এসব ডায়েট শুরু করে। কঠিন এসব ডায়েট টিনএজারদের শারীরিক বিকাশের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। বরং সুষম খাবার গ্রহণ ও কিছু সময় পর পর ডায়েট চার্ট অনুযায়ী খাবার খাওয়াই ভালো।
বাড়তি যত্ন
- ডায়েটের পাশাপাশি প্রতিদিন সাত থেকে আট গ্লাস পানি পান করতে পারো। এতে ত্বক, শরীর যেমন ভালো থাকবে। তেমনি খাবার ভালো হজম হবে ও অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার চাহিদা কমবে।
- অতিরিক্ত মানসিক চাপ হরমোনাল পরিবর্তন ঘটিয়ে ওজন বৃদ্ধি করতে পারে। তাই আবেগ ও দুশ্চিন্তা নিয়ন্ত্রণে রাখাই ভালো। এতে মনও ফুরফুরে থাকবে।
- সুস্বাস্থ্যের জন্য সঠিক ওজন থাকাই ভালো। তবে ওজন কমানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগো না। স্থূলতা বা শুকিয়ে যাওয়া নিয়েও মনঃক্ষুণ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। মনে রেখ, সুন্দরের নির্ধারিত সংজ্ঞা নেই। বরং নিজেকে ভালোবাসা এবং ভালো কাজের মধ্য দিয়েই সুন্দর সব মানুষ।