১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিলে নামে ঢাকার ছাত্র-জনতা। সেদিন পাকিস্তানি পুলিশের গুলিতে নিহত হন সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারসহ অনেকে। নির্বিচার হত্যার প্রতিবাদে পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি আবারও উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা। এদিন আবারও পাকিস্তানি জান্তার গুলিতে যারা মারা যান তাদের মধ্যে একজন ছিলেন ৯ বছরের শিশু অহিউল্লাহ। ভাষার জন্য যারা প্রাণ দিল তাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ শহিদ ছিলেন তিনি।
১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। আগের দিন মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে অনেকগুলো তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ায় সকাল থেকেই থমথমে ঢাকার পরিবেশ। এর মধ্যেই বিভিন্ন এলাকায় দমকা হাওয়ার মতো ভাষা শহিদদের হত্যার প্রতিবাদে মানুষের ঢল নামে মিছিলে। পুরান ঢাকার নবাবপুর রোড থেকেও দেখা যায় গণমানুষের ঢল। মিছিলটি পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা হয়ে শেষ হওয়ার কথা ছিল সদরঘাট এলাকায়। পথে পুরান ঢাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যোগ দেয় এই মিছিলে। রাজমিস্ত্রি হাবিবুর রহমানও বসবাস করতেন এই নবাবপুর এলাকায়। তার ৯ বছর বয়সী ছেলে অহিউল্লাহ তখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। কোঁকড়া চুল, ছিপছিপে গড়নের অহিউল্লাহ ছিল স্বভাবে চঞ্চল। ছবি আঁকতে আর বাড়ির আশপাশে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসত সে। পাকিস্তানিরা মাতৃভাষা বাংলা কেড়ে নিতে চায়। তার প্রতিবাদে রাস্তায় মানুষের ঢল, মৃত্যু বড়দের মুখে মুখে শুনে এ কথাও জানত সে। নবাবপুর রোডে যখন মিছিল শুরুর খবর পায় তখন বাড়ির সবার অলক্ষ্যে অহিউল্লাহ বেরিয়ে যায় সেই মিছিলে যোগ দিতে। তখন তার পরনে ছিল হাফ হাতা শার্ট আর বুকপকেটে এক টুকরো কাগজে তার আঁকা প্রজাপতির ছবি। মিছিলের একপর্যায়ে অহিউল্লাহ গিয়ে দাঁড়ায় পুরান ঢাকা এলাকার খোশমহল হোটেলের সামনে। হঠাৎ এ সময় অস্ত্রবাহী গাড়ি থেকে হামলা চালায় পাকিস্তানি পুলিশ। পুলিশের একটি গুলি লাগে অহিউল্লাহর মাথায়। সঙ্গে সঙ্গেই মাথার খুলি উড়ে যায় বালক অহির। খোশমহলের সামনে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে।
মৃত্যুর কিছু সময় পর বাড়িতে অনেকক্ষণ ছেলের খোঁজ না পেয়ে তাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছিল বাবা হাবিবুর রহমান। খোশমহল হোটেলের সামনে এসে আশপাশের মানুষের কাছে জানতে পারেন পুলিশের গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল তার অহি। সঙ্গে সঙ্গেই হাবিবুর ছেলের লাশ পেতে ছুটে যান ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে। কিন্তু বাবার কাছে ছেলের লাশও মেলেনি হাসপাতালের মর্গে। অহিউল্লাহর লাশ আগেই সরিয়ে ফেলেছিল পাকিস্তানি পুলিশ। রাতের অন্ধকারে তারা গোপনে অহিউল্লাহকে কবর দেয় ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে।
পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ভাষা শহিদদের তালিকায় প্রকাশিত হয় অহিউল্লাহর নাম ও মৃত্যুর ঘটনা। কবি আহমদ রফিকের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘একুশ থেকে একাত্তর’ বইয়ে পাওয়া যায় তার নাম। তবে তার কবরের খোঁজ পায়নি কেউ। এমনকি অহিউল্লাহর কোনো তোলা ছবি ছিল না তার পরিবারের কাছে। ইতিহাসের পাতায় আমরা তার যে ছবিটি দেখতে পাই সেটি এঁকেছিলেন শিল্পী শ্যামল বিশ্বাস। অহিউল্লাহ মারা যাওয়ার পর পরিবার, পরিচিতজনের বর্ণনা শুনে আঁকা অহিউল্লাহর ছবি আর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া ভাষার মাঝেই মিশে আছে তার উজ্জ্বল স্মৃতি।