দৃষ্টিনন্দন গেট, সুবিশাল প্যান্ডেল। ভেতরে হাজারও মানুষের একসঙ্গে বসে ইফতার করার জন্য সাজানো টেবিল চেয়ার। দেখে মনে হবে রাষ্ট্রীয় কোনো ভিআইপির জন্য বিশাল কোনো আয়োজন। বাস্তবে শহরের ছিন্নমূল মানুষদের জন্যই এই এলাহি আয়োজন। চট্টগ্রাম নগরীর বিপ্লব উদ্যানে এ আয়োজন করা হয়েছে। এখানে প্রথম রোজা থেকে প্রতিদিন ইফতার ও সাহরি খাচ্ছেন হাজারও মানুষ। তবে শুধু নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এই আয়োজন সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। এখানে প্রতিদিন আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে শহরের বিত্তবানদেরও। তারাও অভাবীদের সঙ্গে এক টেবিলে একই মেন্যু দিয়ে ইফতার ও সাহরি করছেন। প্রথম দিন তাদের সঙ্গে ইফতার করে কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
গত শুক্রবার সরেজমিন পরিদর্শনকালে কথা হয় চট্টগ্রাম নগরের সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক দবির মিয়ার সঙ্গে। তিনি জানান, সারা দিন অটোরিকশা চালিয়ে ইফতারের আগে প্রতিদিন তিনি হাজির হন বিপ্লব উদ্যানে। শুধু তিনি নন, তার মতো আরও অনেকেই ইফতারের আগে চলে আসেন ষোলশহর দুই নম্বর গেটের এই উদ্যানে। যেখানে প্রতিদিন প্রথম রোজা থেকে হাজারও মানুষ ইফতার করছেন। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন আয়োজিত এই ইফতার আয়োজনে ধনী-গরিবের কোনো ভেদাভেদ নেই। আপ্যায়নেও নেই কোনো বৈষম্য। সবাই একসঙ্গে বসেন। এখানে সবাইকে একই ধরনের খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। ইফতার করতে আসা দবির মিয়া গত বছর থেকেই এখানে ইফতার করেন বলে জানান।
তুলাতলী থেকে পরিবার নিয়ে সাহরি খেতে আসা কয়েকজন জানান, বাসায় সাহরি খাওয়ার সামর্থ্য থাকলেও প্রতিদিন মাংস, ডিম খাওয়ার সামর্থ্য নেই। তবে বিদ্যানন্দের এই আয়োজনে মাংস এবং ডিমের মতো পুষ্টিকর খাবার থাকে। তাই আমরা নিয়মিত আসার চেষ্টা করি। তারাও আন্তরিকতার সঙ্গে আপ্যায়ন করছেন। যেন অনেক পুরোনো আত্মীয়।
তারা বলেন, ‘আমরা যারা সমাজের অভাবী মানুষ তাদের নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাদের জন্য এই ধরনের আয়োজন বিরাট ব্যাপার। দুশ্চিন্তা দূর হওয়ার পাশাপাশি ভালোভাবে পেট পুরে খাওয়ার সুযোগ মিলছে।’
জানতে চাইল বিদ্যানন্দের কর্মী মোহাম্মদ ওমর ফারুক খবরের কাগজকে বলেন, প্রথম দিন দেড় হাজার রোজাদার বিপ্লব উদ্যানে ইফতার করেছেন। সাহরি খেয়েছেন তিন শতাধিক মানুষ। সাহরি ও ইফতারে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে বলে তিনি জানান।
তিনি জানান, এই আয়োজনটা সবার জন্য। চলতি পথে যেসব মানুষ ইফতারির সময় দুই নম্বর গেট এলাকা হয়ে যান তাদের অনেকেই এখানে ইফতার করেন। বেশকিছু রিকশা ও অটোরিকশা চালক, শ্রমিক, ভিক্ষুক নিয়মিত সাহরি ও ইফতার খেতে আসছেন। এ ছাড়া তুলাতলী, ষোলশহর রেলস্টেশনসহ আশপাশের কিছু লোক পরিবার নিয়ে নিয়মিত সাহরি ও ইফতার খেতে আসছেন, যারা হয়তো পরিবারের সদস্যদের জন্য ভালো সেহরি ও ইফতারের আয়োজন করতে পারছেন না। তারাই পরিবার নিয়ে আসছেন বলে তার ধারণা।
আয়োজকরা জানান, ইফতারিতে ছোলা, জিলাপি, বেগুনি, ডিম চপ, সালাদ, খেজুর, পায়েস, শরবত, তেহারি, মুড়ি দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।
সাহরিতে আপ্যায়ন করা হয়, গরুর মাংস, মুরগির মাংস, ভাত,তেহারি, ডিম ও সালাদ দিয়ে।
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের পরিচালক জামাল উদ্দিন খবরের কাগজকে জানান, এক টাকায় আহার কর্মসূচির আওতায় আমরা চট্টগ্রামে লক্ষ মানুষের মাসব্যাপী ইফতারের আয়োজন করেছি। আমাদের স্লোগান হলো ‘সিয়াম সাধনায় একসঙ্গে’। এখানে রয়েছে সাহরির ব্যবস্থাও। এই কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা নিম্ন আয়ের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। এই আয়োজনের মাধ্যমে রোজাদাররা তৃপ্তিসহকারে ইফতার ও সাহরি খেতে পারছেন। অনেকেই পরিবারের ছোট সদস্যদেরও নিয়ে আসছেন। তাতে তাদের পরিবারের সাহরি ও ইফতার নিয়ে দুশ্চিন্তা দূর হচ্ছে। এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দের ব্যাপার। বিদ্যানন্দ গত বছরও এই ধরনের আয়োজন করেছিল। তাতে ব্যাপক সাড়া পাওয়ার পর এ বছরও আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে একই ধরনের আয়োজন করেছি। চট্টগ্রামের আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতা করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।
তিনি বলেন, ইফতারে যাতে রোজা ভাঙার পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্যও ভাঙতে পারি সেই উদ্দেশ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে এত বড় আয়োজন আমরা করেছি। এখানে সমাজের বিত্তবান ও সাদা মনের মানুষদেরকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি বলেন ফাউন্ডেশন ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও কুড়িগ্রামে তিন লাখ মানুষের ইফতার ও সাহরির আয়োজন করছে এবার।