এমন একটা সময় ছিল যখন মানুষ লিখতে শিখেছিল, কিন্তু কাগজ বানাতে শেখেনি। কোনো কোনো দেশে তখন পাথরে খোদাই করে লেখার রীতি ছিল। কেউ নরম মাটিতে লিখে সে মাটি পরে পুড়িয়ে ইটের টালি বানিয়ে নিত। সে ইটেতেই তাদের কাগজের কাজ চলত। কিন্তু এরকম ইঁটের টালি নিয়ে লেখাপড়া করা যে বিশেষ অসুবিধার কথা সেটা সহজেই বুঝতে পার।
মনে করো কোনো ছাত্র স্কুলে যাচ্ছে। অমনি তার সঙ্গে সঙ্গে তিন ঝুড়ি ইটের পুঁথি চলল। আর লেখার জন্য এক তাল কাদা। সামান্য কয়েকটা চিঠি পাঠাতে হলেই খুব পরিশ্রম। মাটি আনরে, জল আনরে, ঠেসে কাদা কররে, চৌকস কররে, টালি বানাওরে, তারপর তাতে অক্ষর লেখরে, পোড়াওরে, ঠান্ডা কররে, মুটে ডাকরে— ঝামেলার শেষ নেই।
এর চেয়ে আমাদের দেশে যে গাছের পাতায় লেখার রীতি অনেকদিন ধরে চলে আসছে সেটা অনেক সহজ ও সুবিধাজনক। ছয় হাজার বছর আগে মিসরে ‘প্যাপিরাস’ গাছের কঁচি ছাল পিটিয়ে থ্যাৎলা করে কাগজের মতো একরকম জিনিস তৈরি করত। এই প্যাপিরাস শব্দ থেকেই ইংরেজি পেপার (Paper) শব্দ এসেছে। যদিও এই প্যাপিরাস জিনিসটাকেও ঠিক কাগজ বলা যায় না। কাগজ তৈরির উপায় প্রথম বের হয়েছিল চীনদেশে; কিন্তু চীনারা এই বিদ্যা আর কাউকে শেখাত না। প্রায় ১২০০ বছর আগে কিছু চীনা কারিগর আরবদের সঙ্গে যুদ্ধে ধরা পড়ে। তাদের কাছে আরবের কারিগররা কাগজ বানানো শিখে নিল এবং সেসময় থেকেই এই বিদ্যা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আরব থেকে মিসর, মিসর থেকে আফ্রিকার অন্যান্য জায়গায় ছড়ায়।
তারপর স্পেন, জার্মানি, ইংল্যান্ড- সব জায়গায় ধীরে ধীরে কাগজের কারখানা দেখা দিল। সে সময়ে ছেঁড়া নেকড়া দিয়ে সব কাগজ তৈরি হতো এবং সেটা আগাগোড়াই হাতে হতো। পরিষ্কার নেকড়াকে ভিজিয়ে একটা দাঁতাল জিনিস দিয়ে ঠেঙান হতো; তাতে জল মিশিয়ে আরও অনেকক্ষণ পেটালে কিছুটা পাতলা মণ্ডের মতো একটা জিনিস হয়। এই নেকড়ার মণ্ডকে চালনিতে চেলে নানাভাবে ছেঁকে ঝেঁকে, লুচির মতো বেলে তবে কাগজ তৈরি হতো। ওই সময়ের মানুষ কাগজকে খুব একটা সৌখিন জিনিস বলে মনে করত, কিন্তু ধীরে ধীরে কাগজের দাম কমে এলো, কাগজ বানানোর নানা রকম কল বের হলো আর কাগজের কাটতি এত বেড়ে গেল যে, কাগজওয়ালারা দেখল এক ছেঁড়া নেকড়াই জোগাড় করা সম্ভব নয়। তখন চারদিকে খোঁজ পড়ে গেল, আর কী জিনিস থেকে কাগজ তৈরি করা যেতে পারে। প্রথমত স্পেন দেশের এস্পার্টো ঘাসে খুব কাগজ হতো, তারপর দেখা গেল তাতেও কুলাচ্ছে না। তখন থেকে কাগজ বানানোর জন্য কত জিনিস নিয়ে যে পরীক্ষা হয়েছে তা বলা যায় না। আখের ছোবড়া, কলার খোসা, পাট, খড়, ঘাস, বাঁশ, কাঠ—সুতার মতো আঁশওয়ালা, আখের মতো ছোবড়াওয়ালা যতরকম জিনিস আছে তার কোনোটাই বাকি নেই। মোটের ওপর বলা যেতে পারে কাঠ, এস্পার্টো ঘাস আর পুরাতন নেকড়া ও কাগজ থেকেই আজকাল কাগজ তৈরি হয়।
বোলতা যে চাক বানায় তার মধ্যে একটা জিনিস থাকে সেটা ঠিক কাগজের মতো। বোলতারা গাছের শাঁস খায় এবং সেই শাঁসকে চিবিয়ে হজম করে এক কাগজ বের করে। আজকাল কাগজের কলেও সেভাবে কাঠ ঘাস- এসব জিনিস থেকে নানারকম কাগজ তৈরি হয়। অবশ্য কাগজওয়ালাদের ওসব জিনিস বোলতার মতো চিবোতে হয় না; এসব কাজই কলে হয়।
যে কাঠ থেকে কাগজ প্রস্তুত হয় সে কাঠ আসে আমেরিকা ও নরওয়ের জঙ্গল থেকে। জঙ্গলওয়ালারা বড় বড় গাছের গুঁড়ি কেটে কলের মুখে ফেলে দেয়। আর কলের এক মাথায় কাঠ কুচি হয়ে বের হয়। সেই কুচিকে গুঁড়িয়ে, সেদ্ধ করে পরিষ্কার করতে হয়, তারপর সেই ক্ষীরের মতো নরম কাঠকে চাপ দিয়ে পাতলা পাতলা পাটালি বানান হয় এবং সেই পাটালি কাগজওয়ালাদের কাছে পাঠানো হয়।
কাগজওয়ালারা এই পাটালিকে আবার জলে ঘুঁটে মণ্ড তৈরি করেন, সেই মণ্ডকে সেদ্ধ করে ঝোলের মতো করেন। এই ঝোল লোহার নলে করে কাগজের কলের মধ্যে ঢেলে দেওয়া হয়। কল একদিকে কাঠ, ঘাস বা নেকড়ার ঝোল খেতে থাকে আর একদিকে ৪-৫ মাইল লম্বা কাগজের থান বের করতে থাকে। দিন-রাত কল চললে বারো হাত চওড়া আড়াই মাইল লম্বা একটা কাগজের থান বের হয়। তারপর গরম পানির চৌবাচ্চার মধ্যে সেই মণ্ড গুলিয়ে ঝোল তৈরি হয়।
ঝোলটা যখন কলের মধ্যে চালান হয় তখন সেটা একটা লম্বা চলন্ত ছাঁকনির ওপর পড়ে। ছাঁকনিটা চলতে থাকে আর মাঝে মাঝে কেমন একটা ঝাঁকানি দেয়, তাতে পানি ঝরে যায় এবং ঝোল ধীরে চাপ বেধে আসে। এমনিভাবে চলতে চলতে ঝোলটা কলের আরেক মাথায় এসে পড়ে। সেখানে লুচি বেলার বেলুনের মতো অনেকগুলা রোলার লাগানো থাকে। ছাঁকনিটা এখানে এসে ঝোলটাকে একটা রোলারের গায়ে ছিটকে দেয়। কিন্তু সে ঝোল আর এখন ঝোল নেই; এখন তার চেহারা অনেকটা ভেজা ব্লটিং কাগজের মতো। এতক্ষণে তাকে ঠিক কাগজ বলা চলে।
রোলারের গায়ে কাগজ লাগামাত্র রোলার তাকে টানতে থাকে। তারপর সেই টানে কাগজও অনেকগুলো রোলারের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। এমনি করে কাগজটাকে ক্রমাগত চাপ দিতে হয়, লুচির মতো বেলতে হয়, ঘঁষতে ও পালিশ করতে হয়, তাতেই কাগজ ধীরে ধীরে পাতলা ও মোলায়েম হয়ে আসে।
অবশ্য এসব কাজই কলে আপনা-আপনি হতে থাকে। দু-একজন লোক থাকে তারা কেবল দেখে সব কল ঠিকভাবে চলছে কি না। চব্বিশ ঘণ্টা সমান হিসেবে কাজ চলে; কলের এক মাথায় অনবরত ঝোল এসে পড়ছে। সেই ঝোলশুদ্ধ ছাঁকনি কেবলই ছুটছে, ছাঁকনি থেকে জমাটবাঁধা কাগজ কেবলই রোলারের ওপর লাফিয়ে পড়ছে, রোলারেরও বিশ্রাম নেই, সেও কাগজ টানছে আর ঠেলে বের করছে। দুচার মাইল কাগজ জমলেই এক একটা ‘লাটাই’ ভরে ওঠে, তখন ‘লাটাই’ বদলে আবার নতুন ‘লাটাই’ আটকে দিতে হয়।
সাধু থেকে চলিত ভাষায় রূপান্তরিত
মোহনা জাহ্নবী