রামছাগল যাচ্ছিল শ্বশুরবাড়ি। পায়ে তার জরির জুতা ঝকমক করছে। গায়ে বাহারি রঙের পাঞ্জাবি।
গলায় গামছা, হাতে দামি ঘড়ি। ঘর থেকে বের হওয়ার আগে সে গায়ে মেখেছে বেলি ফুলের খুশবু। শ্বশুরবাড়ি বলে কথা! মানসম্মান ও শান শওকতের সঙ্গেই যেতে হবে।
রামছাগলের বাস ছিল রসুলপুর গ্রামে। সে গ্রামের পরেই ছিল একটা গহীন বন। বন পার হলে তবেই কৃষ্ণ গড়াই গ্রাম। আর সেই গ্রামেই তার শ্বশুরবাড়ি। তার বউ আর ছেলেমেয়েরা অনেক দিন হলো সেখানে গিয়ে বসে আছে। ফিরে আসার নামটি নেই। তাই রামছাগল এবার নিজেই চলেছে বউ, ছেলেমেয়েদের ফিরিয়ে আনতে।
হাঁটতে হাঁটতে রসুলপুর গ্রাম পেরিয়ে বনের কাছাকাছি এল সে। তারপর বনের মাঝ দিয়ে হাঁটতে লাগল। পথ দীর্ঘ হওয়ায় সময় কাটাতে বাসা থেকে ঠোঙা ভরে বাতাসা নিয়ে এসেছিল। চলার পথে একটা একটা করে সে বাতাসা খেতে খেতে এগোতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় সন্ধ্যা হয়ে এল।
সে তখন বনের মাঝখানে। দেখল সামনে বিশাল এক বটগাছ। বটগাছের পেছনেই লতাপাতার জঙ্গল। হাঁটতে হাঁটতে রামছাগলের বেশ খিদে পেয়েছিল। সে লতাপাতার জঙ্গলে ঢুকে প্রাণভরে কচি পাতা খেয়ে নিল। তারপর পাশের একটা ডোবা থেকে পানি খেয়ে তার ছাগলা দাড়িতে তা দিতে দিতে ফিরে এল সেই বটগাছটার কাছে।
ততক্ষণে রাত নেমেছে। সে দেখল বটগাছটার নিচে একটা বড় গর্ত। রামছাগলটা খুশি হয়ে উঠল। গামছাটা বিছিয়ে সেখানেই শুয়ে পড়ল। আর সারা দিনের ক্লান্তিতে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নাক ডেকে ঘুমিয়ে গেল। ঘ... ঘ... ঘরর... ঘড়াৎ... ঘরর...
সে কী নাক ডাকা! নাক ডাকার আওয়াজে পাশের ছাতিম গাছের ডালে ঘুমিয়ে থাকা হুলো বিড়ালটার ঘুম ভেঙে গেল। সে আর সারা রাত ঘুমাতে পারল না। হুলো বিড়াল রেগে গিয়ে মনে মনে ভাবল, তাকে প্রতিশোধ নিতেই হবে।
পরের দিন সূর্য উঠল, সকাল হলো। রামছাগল ঘুম থেকে উঠে ডোবায় হাতমুখ ধুয়ে লতাপাতার জঙ্গল থেকে নাশতা খেয়ে আবার শ্বশুরবাড়ির দিকে রওনা দিল। ওই দিকে দুষ্টু হুলো বিড়ালটা পথের বাঁকে একটা বাঁশ ঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে ছিল। রামছাগল বাঁক ঘুরে সামনে আসতেই হুলো বিড়ালটা রামছাগলের মাথায় ঝাঁপিয়ে পড়ে তার চোখে মুখে কয়েকটা খামচি দিল।
রামছাগল গেল রেগে। সে তার শিং দিয়ে হুলো বিড়ালকে দিল বেদম ধাক্কা। ধাক্কা খেয়ে হুলো বিড়ালটা জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। জ্ঞান যখন ফিরে এল, দেখল রামছাগলটা চলে যাচ্ছে। লাফ দিয়ে রামছাগলের পিঠে চড়ে বসল হুলো বিড়াল। তার পাঞ্জাবিটা কামড়ে খামচে ছিঁড়ে দিল। তারপর দৌড়ে পালাল।
রামছাগল আর কী করে, ছেঁড়া পাঞ্জাবি পরে তো আর শ্বশুরবাড়ি যাওয়া যায় না। সে কাঁদতে কাঁদতে নিজের বাসার দিকে রওনা দিল।