বাংলাদেশে এতদিন কোনো আয়কর আইন ছিল না। ছিল ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ। প্রায় চার দশক পর সরকার নতুন আয়কর আইন কার্যকর করে। নতুন আয়কর আইন কার্যকর করা হয়েছে গত জুলাই থেকে। এর আগে চলতি বছরের ১০ জুন জাতীয় সংসদে আইনটি পাস হয়। এই আইনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি সহজ ও বাংলা ভাষায় রচিত। নতুন আইনে ৩৪৫টি ধারা আছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নতুন আইনের ভালো-মন্দ দুটি দিকই আছে। তবে ভালোর চেয়ে মন্দের দিকই বেশি। এটি বাস্তবায়নের আগে কমপক্ষে এক বছর সময় দেওয়া উচিত ছিল। নতুন আয়কর আইনে ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হয়নি। আলোচনা হয়নি সংসদে। আইনটি প্রণয়ন করেছে এনবিআর। যিনি রক্ষক তিনিই ভক্ষকের ভূমিকা পালন করেছেন। পৃথিবীর কোনো দেশে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা আইন করে না। বিশেষজ্ঞরা আরও বলেছেন, আগের আইনের সঙ্গে নতুন আইনের মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এত জটিল করা হয়েছে যে তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। যদিও এনবিআরের কর্মকর্তারা বলেন, এই আইন বাস্তবায়নযোগ্য এবং ব্যবসা ও করদাতাবান্ধব।
নতুন আইনে চার ধাপে অডিটের কথা বলা হয়েছে। অনুসন্ধান দল, অডিট টিম, অডিট কিউরেটর ও কমিশনার। এই চার স্তরে অডিট করা হলে করদাতাদের হয়রানি আরও বাড়বে।
আগের আইনে ব্যক্তিশ্রেণি করদাতার ক্ষেত্রে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা বাবদ বছরে সাড়ে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত কর ছাড়ের কথা বলা হয়েছে। নতুন আইনে এই সুবিধা কমানো হয়েছে। এর ফলে মধ্যম প্রান্তিক করদাতার করের বোঝা বাড়বে। নতুন আইনে ৪০ লাখ টাকার বেশি সম্পদ হলে অবশ্যই সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এটি বাধ্যবাধকতা করায় অনেকেই ভয়ে রিটার্ন জমা দেবেন না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এটা আরও শিথিল করা উচিত ছিল।
নতুন আইনে ব্যবসার লাভ-ক্ষতির হিসাব সমন্বয়ের নিয়ম কঠিন করা হয়েছে। ছোট, মাঝারি, বড়- সব ব্যবসায়ীকে ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন বা ক্যাশলেস লেনদেন করার কথা বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এটি একটি অবাস্তব পদক্ষেপ। এতে করে ছোট ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়বেন। নতুন আইনে পদ্ধতিগত সংস্কারে জোর দেওয়া হয়নি। ফলে বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
বর্তমানে ৩৮টি সরকারি-বেসরকারি সেবা নিতে হলে বার্ষিক আয়কর বিবরণী বা রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র লাগে। নতুন আইনে এই তালিকায় আরও পাঁচটি খাত ঢোকানো হয়েছে। তবে কয়েকটি শর্তের আলোকে টিআইএন বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। আবার অনেকে এর সঙ্গে ভিন্নমতও প্রকাশ করেন। তারা মনে করেন, অডিট নিয়ে বেশি অভিযোগ আছে। সে জন্য অডিটকে করদাতাবান্ধব করা হয়েছে। আগে অডিটের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা ছিল না। নতুন আইনে একটি ম্যানুয়াল করে দেওয়া হয়েছে কীভাবে অডিট করতে হবে। ফলে আগের মতো অডিটের নামে যা ইচ্ছা তা করার সুযোগ নেই।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, ভারতে আইন কমিশন আয়কর আইনের খসড়া তৈরি করেছে। অংশীজনের (স্টেকহোল্ডার) মতামতের পর সংসদে আলোচনা করে তা আইনে পরিণত করা হয়। আমাদের দেশে সংসদে আয়কর আইনের খসড়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে, এমন কথা শোনা যায়নি। সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়নি। ফলে নতুন আইনে জোরজবরদস্তি, হয়রানির মতো বিষয়গুলো রয়েই গেছে। নিশ্চিত করা হয়নি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। এই আইন করদাতা ও ব্যবসাবান্ধব নয় বলে মত দেন তিনি।
নতুন আইনে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে অবশ্যই আয়কর রিটার্ন দাখিলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই নিয়মে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। বছরের যেকোনো সময় দাখিলের সুযোগ থাকলে রিটার্ন জমার সংখ্যা বাড়বে। বাতিল করতে হবে জরিমানার বিধান। নতুন আইনে নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা না দিলে রেয়াত সুবিধা বাতিলের কথা বলা হয়েছে। যার ৫ হাজার টাকা ন্যূনতম কর আসবে সে যদি নির্ধারিত সময়ে আয়কর রিটার্ন জমা না দেয়, তা হলে ৬৭ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা দিতে হবে। এটি বাস্তবসম্মত নয়।
আয়কর বিভাগ ডিজিটালাইজড হলে সব নাগরিকের আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। শুধু করের পরিধি বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে কর আদায় বাড়ানো সম্ভব নয়। পদ্ধতিগতভাবে সংস্কার ও উপযুক্ত পরিবেশ সুনিশ্চিত জরুরি। যেটা এখনো সময়োপযোগী হয়ে ওঠেনি। অবিলম্বে সরকারকে এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।