পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে রয়েছে সরকারের আর্থিক সহায়তা। এর পরও ঘুরে দাঁড়ায়নি এ খাত। কয়েক বছর ধরে এ খাতের মন্দাবস্থায় পাট রপ্তানিতে ব্যাপক ধস পরিলক্ষিত হচ্ছে। সরকারি প্রণোদনাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না সোনালি আঁশ নামে খ্যাত পাট খাত। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ মাসে পাট থেকে তৈরি সুতা, বস্তা, ব্যাগসহ পাটজাত পণ্যের রপ্তানি কিছুটা কমেছে। যদিও সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানান, পাট ও পাটজাত পণ্য উৎপাদনে সরকার সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে। বর্তমানে পাটের উৎপাদন ও পাটপণ্যের ব্যবহার বাড়ছে। অনেকে পাট ও পাটপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করে ভাগ্যের পরিবর্তন করছেন। বাংলাদেশের রপ্তানি করা পাটপণ্যের তালিকায় রয়েছে কাঁচা পাট, পাটের সুতা, পাটের বস্তা ও ব্যাগ এবং অন্যান্য পাটজাত পণ্য।
ইপিবির তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি আয় এর আগের বছরের চেয়ে ১৯ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক। গত অর্থবছর এ খাতে রপ্তানি আয় হয়েছিল ৯১ কোটি ২২ লাখ ডলার। এর আগের অর্থবছরে (২০২১-২২) ছিল ১১২ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। গত অর্থবছরে রপ্তানি আয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৯ শতাংশ কম হয়েছে। আলোচ্য সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২৮ কোটি ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানি হয় ১১৬ কোটি ১১ লাখ ডলার।
এ সময় কাঁচা পাট রপ্তানি থেকে আয় এসেছে ২০ কোটি ৪১ লাখ ডলার। পাটের সুতা থেকে আয় হয়েছে ৪৯ কোটি ৭৯ লাখ ডলার এবং পাটের বস্তা থেকে আয় হয়েছে ১০ কোটি ৯৮ লাখ ডলার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁচা পাটে আগের বছরের চেয়ে আয় কমেছে ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ; পাটের সুতার আয় কমেছে ২৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং পাটের বস্তা থেকে আয় কম হয়েছে প্রায় ৮ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি কমার কারণ সম্প্রতি কাঁচা পাটের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া। একই সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে পরিবহন খরচ। এতে পাটপণ্য রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জানা যায়, পাট ও পাটজাত পণ্যে সরকার ২০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ সহায়তা দিচ্ছে। তারপরও পাটপণ্যের রপ্তানি কমতির দিকটা ঠেকানো যাচ্ছে না। বিশ্ববাজারে মন্দা হলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে দুই বছর ধরে পাটের দর বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ ২০২০ সালে প্রতি মণ (৪০ কেজি) কাঁচা পাটের দাম ছিল ৩ হাজার টাকা। বর্তমানে সেই একই পাট বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৬ হাজার টাকায়। পাটপণ্য রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ে কাঁচা পাটের দাম ছিল মণপ্রতি ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা। গত মৌসুমে পাটের দাম ৬ হাজার থেকে ৬ হাজার ৫০০ টাকা হয়ে যায়।
অধিক মূল্যস্ফীতি ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাব সৃষ্ট বিশ্বমন্দায় উন্নত দেশে পাটের তৈরি কার্পেটের চাহিদা অনেকাংশে কমেছে। তুরস্কসহ কয়েকটি দেশে পাটের কার্পেট তৈরি হয়। এসব দেশে পাটের চাহিদা অনেক বেশি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব দেশে পাটের সুতা ও টুইনের চাহিদা অনেক কমেছে। বাংলাদেশের পাটজাত পণ্যের বড় বাজার সুদান। দেশটিতে গৃহযুদ্ধের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে সেখানেও এসব পণ্যের রপ্তানি কমেছে। পাটশিল্পের উপখাতগুলোর মধ্যে পাটের সুতা ও টুইন থেকে রপ্তানি আয়ও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। এ ছাড়া দেশে কাঁচা পাটের দাম অনেক বেশি। সে কারণে ক্রেতারা পাটের সুতার বিকল্প হিসেবে তুলাবর্জ্য ও সিনথেটিক ফাইবারের দিকে ঝুঁকছেন। এসব কারণে পাট ও পাটপণ্যের ব্যবহার ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
বাংলাদেশ জুটপণ্য রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান এম আহমেদ মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, কয়েক বছর ধরে দেশের পাট ও পাটপণ্য খাত মন্দা সময় পার করছে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পাটপণ্য আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে রপ্তানি হয়। তবে ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে পাটজাত পণ্যের ওপর ভারত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে। একই সঙ্গে কাঁচা পাটের উচ্চমূল্য এ খাতের রপ্তানিকে প্রভাবিত করেছে।
পরিবেশবান্ধব পাট ও পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে হবে। জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে এ পণ্যের বহুবিধ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কাঁচা পাটের দাম ও পরিবহন খরচ সহনীয় মাত্রায় আনতে হবে। পাটপণ্য রপ্তানিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সোনালি আঁশ খ্যাত এ খাতটিকে বাঁচিয়ে রাখা দরকার। যদিও সরকার এ খাতে নগদ সহায়তা ও প্রণোদনা দিচ্ছে, তারপরও কেন এ খাতে রপ্তানিতে ধস তা পর্যবেক্ষণ করে সমাধান করতে হবে। আশা করছি, খুব শিগগির পাট ও পাটজাত শিল্পের সুদিন ফিরে আসবে।