পাশ্চাত্য দেশগুলোতে ‘ব্যাংকাসুরেন্স’-এর প্রবর্তন হয়েছে বেশ আগেই। বাংলাদেশে বিষয়টি একেবারেই নতুন। চলতি ডিসেম্বরে এটির সূচনার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এসেছে। এটি প্রবর্তনের ফলে ব্যাংকে তারল্যপ্রবাহ বাড়বে, বিমা কোম্পানির ব্যবসার ব্যয় সাশ্রয় হবে এবং দুই খাতের চুক্তিবদ্ধ কোম্পানির ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি হবে। ব্যাংকগুলো বিমা গ্রাহকের জন্য ভবিষ্যতে পৃথক ঋণ ও সঞ্চয় বা আমানতসহ অন্যান্য আর্থিক সেবার সুযোগ করে দিতে পারবে। নতুন এ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক ও বিমা কোম্পানি দুই পক্ষই লাভবান হবে।
ফ্রান্স ১৯৭০-এর দশকে প্রথম ‘ব্যাংকাসুরেন্স’-এর সূচনা করে। এরপর স্পেনসহ অন্যান্য দেশে ব্যাংকের মাধ্যমে বিমা বিক্রির এ পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়। ভারত ২০০০ সালে এর প্রবর্তন করে।
চলতি বছরের জুলাইয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ দেশে প্রথম ব্যাংকাসুরেন্স প্রবর্তনের নীতিগত ঘোষণা দেয়। তারই আলোকে গত ২০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক একটি দিকনির্দেশনা বা গাইডলাইন দিয়ে সে অনুসারে ব্যাংকগুলোকে বিমা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কার্যক্রম শুরু করতে নির্দেশ দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন অনুযায়ী, ব্যাংকাসুরেন্সে অংশগ্রহণ করতে ব্যাংক বা বিমা কোম্পানির কোনো বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়নি। এতে বলা হয়, কেবল ‘করপোরেট এজেন্ট’ হিসেবে ব্যাংক বিমা কোম্পানির পলিসি বিক্রি করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে একটি ব্যাংক সর্বোচ্চ তিনটি বিমা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে পারবে। ব্যাংক বিমা বা ইন্সুরেন্স কোম্পানির পলিসি বিক্রি করা হবে। এই পদ্ধতিই হচ্ছে ‘ব্যাংকাসুরেন্স’।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এ পদ্ধতির ওপর গ্রাহকের আস্থা বেশি। কারণ, প্রথাগত পদ্ধতি অনুযায়ী ৫০ বছর ধরে দেশে বিমা কোম্পানিগুলো এজেন্ট, দালাল বা ব্যক্তির মাধ্যমে বিমা পলিসি বিক্রি করেছে। এতে কখনো কখনো গ্রাহকের টাকা তার পলিসিতে জমা হয়নি। আত্মসাৎ হয়েছে। আবার বিমা কোম্পানিগুলো পলিসির মেয়াদপূর্তির পর গ্রাহককে টাকা দিতে হয়রানি করছে। এটি ব্যাংক ও বিমা কোম্পানির চুক্তির আলোকেই হবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইনে বলা হয়েছে। এতে করে গ্রাহককে তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ আর থাকবে না।
ব্যাংকাসুরেন্সে অংশগ্রহণকারী ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) থেকে লাইসেন্স অর্জন করতে হবে। তার পরই কেবল বিমা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করে পলিসি বিক্রির কাজ করতে পারবে ব্যাংক। এ জন্য বিক্রীত বিমা পলিসির বিপরীতে কমিশন পাবে ব্যাংক।
ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিমা খাতে মানুষের আস্থার সংকট আছে। ব্যাংক যখন বিমা সেবা বিক্রি করবে, তখন এ আস্থার সংকট কেটে যাবে। কারণ গ্রাহকের কাছে বিশ্বস্ততার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যাংক বেশি নির্ভরযোগ্য। বিমা বিক্রিতে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক ব্যাংককে একটি পৃথক সেল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সে জন্য একজন ‘চিফ ব্যাংকাসুরেন্স অফিসার’সহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করে তাদের মাধ্যমে বিমা পলিসি বিক্রি করতে হবে। শাখা পর্যায়ে ব্যাংকের নিয়মিত কর্মকর্তাদের বিমা পলিসি ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেবে চুক্তিবদ্ধ বিমা কোম্পানি।
প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের সিইও জালালুল আজিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘এটি একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। এটি বিমাশিল্পের গতিশীলতা বাড়াবে। একই সঙ্গে বিমা কোম্পানিগুলো ব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারমূলক বিমাসেবা বিক্রির সুযোগ পেলে ব্যবসার ব্যয় কমবে।’
ব্যাংকের মাধ্যমে বিমা পলিসি বিক্রিতে বিমা কোম্পানির ব্যয় অনেকটা সাশ্রয় হবে। সনাতনী পদ্ধতিতে বিমা কোম্পানি পণ্য বিক্রিতে উচ্চ ব্যয় করছে। বিমা ব্যবসায় মধ্যবর্তী স্থানে ব্যাংকের অন্তর্ভুক্তির ফলে এ খাতের সেবার মান বাড়বে। ফলে এ খাতে গ্রাহকের আস্থার সংকটও কাটিয়ে উঠতে পারবে। ব্যাংকের সঙ্গে তালমিলিয়ে প্রতিনিধি ও এজেন্টরাও নিজেদের সক্ষমতা গড়ে তুলবে। এক কথায় ব্যাংকাসুরেন্স বিমা খাতের গ্রাহকদের বিশ্বস্ততা বাড়াবে।
প্রচলিত পদ্ধতিতে বিমা কোম্পানির পলিসি বা আর্থিক পরিষেবা, ক্রয়, নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ ও ম্যাচিউরিটি শেষে গ্রাহকের প্রাপ্য অর্থ পেতে আর হয়রানির শিকার হতে হবে না। এটি ব্যাংক তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিমা কোম্পানির চুক্তির আলোকে দেওয়া গ্যারান্টি হিসেবে গ্রাহক হয়রানিমুক্তভাবে এ সেবা পাবে। কারণ ব্যাংক একটি প্রতিষ্ঠান। এখানে সুশাসন ও নির্ভরযোগ্যতা আছে। কিন্তু প্রচলিত পদ্ধতিতে বিমা পরিষেবা ক্রয় ও পরবর্তী কার্যক্রমগুলো এজেন্টভিত্তিক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রাহক হয়রানির সুযোগ থেকেই যেত। অভিযোগও আছে অহরহ। ব্যাংকাসুরেন্স প্রবর্তনের ফলে এখন থেকে এজেন্টরাও প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হবে। তাদের সেবার গুণগত মানে উন্নতি না করতে পারলে প্রতিযোগিতায় তারা টিকতে পারবে না।
বিমা কোম্পানির আর্থিক পরিষেবা সাধারণ মানুষ নিয়ে থাকে দুর্ঘটনা, চিকিৎসা, মৃত্যু ও সন্তানের পড়ালেখার ব্যয় নির্বাহ করা ও ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা তৈরি করতে। তাই ব্যাংকাসুরেন্স এ খাতে সেবার মানে উন্নয়ন ঘটাবে বলে ধারণা করা যায়।