ক্ষুদ্রঋণকে দারিদ্র্য দূরীকরণের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে আর্থসামাজিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করা হয়। নিম্ন আয়ের মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সংসারের নানা প্রয়োজন মেটানো, বেকার জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামাঞ্চলে ব্যক্তি ও পারিবারিক ব্যবসা সম্প্রসারণসহ শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে ক্ষুদ্রঋণ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। গত এক বছরে ক্ষুদ্রঋণের গ্রাহকসংখ্যা বেড়েছে ৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এর মধ্যে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেড়েছে ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি বা ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের (এমআরএ) গবেষণায় বলা হয়েছে, দারিদ্র্যপীড়িত লোকজন তাদের অবস্থানের উন্নতি ঘটাতে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে থাকে।
এমআরএর তথ্য থেকে জানা গেছে, ২০২২ সালের জুন শেষে দেশে ক্ষুদ্রঋণগ্রহীতা ছিল ২ কোটি ৯৭ লাখ ৪০ হাজার। গত বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালের জুন শেষে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ১৫ লাখ। এমআরএর অনুমোদিত ৩৭৯ বেসরকারি সংস্থার হিসাবের ভিত্তিতে এ সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংক ও সরকারের বিভিন্ন ঋণদান সংস্থার তথ্য বিবেচনায় নিলে এই সংখ্যা আরও বেশি হবে।
এমআরএ নিবন্ধিত এনজিওগুলো গত এক বছরে ঋণ বিতরণ করেছে ২ হাজার ৮৬১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ২০২২ সালের জুলাই মাসের আগে এক বছরে ঋণ বিতরণ হয়েছিল ১ হাজার ৯১৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা।
ঋণ নিতে আসা পরিবারগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রবাসফেরত, কৃষক, ভূমিহীন কিছু বসতভিটা আছে এমন ব্যক্তি, শিক্ষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ব্যবসা করতে আগ্রহী লোকজন। উচ্চ সুদহার সত্ত্বেও তৃণমূলের মানুষ এনজিওর কাছ থেকে ক্ষুদ্রঋণ নিচ্ছে। কাজের ব্যাপ্তিতে এনজিওগুলোর পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি। তাই ইচ্ছা থাকলেও কোনো এনজিও কম সুদে ঋণ দিতে সমর্থ নয়। অন্যদিকে অবকাঠামো ও জনবল বিবেচনায় ব্যাংকও ক্ষুদ্রঋণে যেতে পারে না। এনজিওগুলোর ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির একটি বড় শক্তি হলো, এটি ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি ও ঘরে ঘরে যোগাযোগ সৃষ্টি করেছে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ ক্ষুদ্রঋণগ্রহীতার সংখ্যা বৃদ্ধিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে মন্তব্য করে খবরের কাগজকে বলেন, ‘মানুষের অর্থের চাহিদা বেড়েছে। কারণ যে হারে জীবনযাপন ব্যয় বেড়েছে, সে তুলনায় আয় ও কর্মসংস্থান বাড়েনি। দীর্ঘ সময় ধরে দেশে টানা যে হারে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, এমন পরিস্থিতি আগে কখনো আসেনি। তাই মানুষের আয় ও ব্যয়ে সঙ্গতি থাকছে না। ফলে বাধ্য হয়ে মানুষ ঋণ করছে। সারা দেশে এমনিতেও ঋণ গ্রহণের অনুপাত বেড়েছে। কেউ প্রয়োজন মেটাতে, আবার কেউ পরিশোধ করতে ঋণ নিচ্ছে। এতে ঋণগ্রহীতা একটি দুষ্টচক্রেও আটকে যাচ্ছে।’
ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বিচ্ছিন্নভাবে। দেশের পুনর্গঠনে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিওগুলো ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম শুরু করে। পরে ১৯৭৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংক এ কার্যক্রমকে একটা সুশৃঙ্খল প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ শুরু করে। পরবর্তী সময়ে শত শত এনজিও এসেছে। একপর্যায়ে সরকারও ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম শুরু করে। কমপক্ষে ১০টি সরকারি এজেন্সি এখন ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি খবরের কাগজের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘সামাজিক উন্নয়নে এনজিও পরিচালিত ক্ষুদ্রঋণ একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে সারা দেশে, বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে। মাইক্রোক্রেডিট এখন মাইক্রোফিন্যান্স বা ক্ষুদ্র আর্থিক সেবায় পরিণত হয়েছে। এটা এখন স্বীকৃত। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুদ্রঋণের ধারণাগত পরিবর্তন হয়েছে। মাইক্রোফিন্যান্স এই অর্থে যে, এটি এখন শুধু ঋণ নয়; এটি এখন একটি প্যাকেজ বা পরিপূর্ণ আর্থিক সেবা।’
এটি সত্য যে, ক্ষুদ্রঋণের ব্যাপকতা বেড়েছে। এই বৃদ্ধি মূলত চাহিদার কারণে। অর্থনীতিতে চাহিদা ও সরবরাহ দুটিই যখন গতিময় হয় তখন প্রবৃদ্ধি ঘটে। ঋণ নেওয়া ও তা নিয়মিত পরিশোধ করার তাগিদ ঋণগ্রহীতার পরিবারে ও ব্যক্তিপর্যায়ে এক ধরনের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা তৈরি করে। এই আর্থিক ব্যবস্থাপনা একটি পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঋণের অর্থ কাজে লাগিয়ে যদি আয় বৃদ্ধি করে কিস্তি পরিশোধ করার ব্যবস্থা সৃষ্টি হয়, সেটি অবশ্যই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা তৈরি করে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা তৈরি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেহেতু ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করা সংস্থাগুলো শুধু ঋণ দেয় না, পরিচর্যা করে ও ঋণগ্রহীতা পরিবারের যাবতীয় খোঁজখবর নেয়; তাই সামগ্রিক অর্থে ক্ষুদ্রঋণের গুরুত্ব ব্যাপক। তবে এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে। ঋণগ্রহীতা যেন দারিদ্র্যের বা ঋণের দুষ্টচক্রে না পড়ে, সেদিকটায় ক্ষুদ্রঋণ বিতরণে নিয়োজিত সংস্থাগুলোকে আরও যত্নবান হতে হবে। প্রয়োজনে কর্মীদের এ ব্যাপারে প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলে তারপরই মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে নিযুক্ত করতে হবে।