স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে শেয়ারবাজারে ব্যাপক পতন রোধ করতে ২০২২ সালের ২৮ জুলাই ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ২০২০ সালের মার্চের শুরুতে বিশ্বব্যাপী মহামারি করোনার কারণে ডিএসইএক্স ৩ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে যায়। এ সময় শেয়ারের অবাধ পতন সীমিত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল। দেশের পুঁজিবাজারের উন্নয়নে নতুন বছরে ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ার প্রত্যাশা করছেন বিনিয়োগকারীরা। অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে। সদ্য বিদায়ী বছরে পুঁজিবাজারের সূচকে খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। বছরজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাংকিং খাতে স্থবিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে পুঁজিবাজারে মন্দাভাব বিরাজ করে। এতে প্রত্যাশা অনুযায়ী মুনাফা করতে পারেননি বিনিয়োগকারীরা। নতুন বছরে গতিশীল পুঁজিবাজার চান বিনিয়োগকারীসহ সংশ্লিষ্টরা।
ফ্লোর প্রাইসের কারণে বাজারে বিশৃঙ্খলা এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়। একই সঙ্গে লেনদেন নেমে আসে তলানিতে। তেমনি বিদেশি বিনিয়োগ অব্যাহতভাবে হ্রাস পেতে থাকে। শেয়ারবাজারে এমন খারাপ অবস্থা ২০১০ সালের পর আর দেখা যায়নি। ফ্লোর প্রাইসের কারণে বেশির ভাগ ভালো কোম্পানির শেয়ারের দাম দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে আছে। এতে বিনিয়োগকারীরা তাদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করতে পারছেন না। ফলে বাজারে দেখা দিয়েছে তারল্যসংকট।
বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করে বলেন, বাজারে বড় সমস্যা শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক আরোপিত ফ্লোর প্রাইস। এতে নতুন কোনো বিনিয়োগ হয়নি। বাজারে লেনদেন ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বাজারে সব ধরনের অংশীজনের আয় কমেছে। এসব পদক্ষেপ অংশীজনদের সক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে। ফ্লোর প্রাইসের কারণে পুঁজিবাজারে বড় বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন। আটকে যাওয়ার ভয়ে তারা নতুন করে বিনিয়োগ করছেন না।
তথ্যমতে, এক বছরের ব্যবধানে ডিএসইর দৈনিক গড় লেনদেন ৩৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫৭৮ কোটি টাকা। আগের বছর যা ছিল ৯৬০ কোটি টাকা। বাজার মূলধন এবং জিডিপি অনুপাত বিদায়ী বছরে ১৭ দশমিক ৫৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ২০২২ সালে ১৯ দশমিক ১৪ শতাংশ থেকে কমেছে।
ইবিএল সিকিউরিটিজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। সামষ্টিক অর্থনীতির উন্নতির পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হলে তা বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি বিএসইসিও আগামী বছর ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের প্রত্যাশা করছে।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, দেশের পুঁজিবাজারে ফ্লোর প্রাইস আরোপের কারণে লেনদেন কমে গেছে। বিশ্বের কোনো দেশের পুঁজিবাজারে ফ্লোর প্রাইস নেই। ফ্লোর প্রাইসের কারণে দেশের বাজারের লেনদেন নেমে এসেছে গড়ে ৫০০ কোটিতে। এটা না থাকলে আমাদের পুঁজিবাজারের লেনদেন ১ হাজার কোটি টাকা হতে পারত।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে সরকার বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রণোদনা দিয়েছে। কিন্তু তাতেও পুঁজিবাজারে গতি আসেনি। আস্থার সংকটে ঘুরপাক খেয়েছে। দুর্নীতিমুক্ত স্মার্ট ও গতিশীল পুঁজিবাজার গঠনের লক্ষ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। ভালো মানের নতুন নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে হবে। অনেক কোম্পানির শেয়ার ফ্লোর প্রাইসে আটকে আছে, সেগুলো পুনরুদ্ধার করা দরকার। বাজারের আস্থার সংকট দূর করতে করপোরেট গভর্ন্যান্সকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে। তাহলেই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।