দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ। এ উপলক্ষে সরকার সারা দেশে নির্বাচনকালীন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। সারা দেশে ৩০০টি আসনে ২৮টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে লড়ছে। বিএনপি, জামায়াত ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো এ নির্বাচন বর্জন করায় এটি অংশগ্রহণমূলক হওয়ার বিষয়ে সরকারের ওপর একধরনের চাপও রয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ‘পোস্টাল ব্যালট’-এ নির্বাচনে অগ্রিম ভোট প্রদান করেছেন। পোস্টাল ব্যালট বাংলাদেশের ভোট ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধির একটি যুগোপযোগী পদক্ষেপ হতে পারে।
চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা অনুযায়ী, এবারের সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে ভোটযুদ্ধে মাঠে নেমেছেন মোট ১ হাজার ৯৭০ প্রার্থী। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ৪৩৬ জন। স্বতন্ত্রদের মধ্যে ১২৭ জন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী। যারা দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়নে নৌকা প্রতীকে প্রার্থী হয়েছেন ২৬৬ জন। জাতীয় পার্টির প্রার্থী ২৮৩ জন এবং বাকিরা তৃণমূল বিএনপিসহ অন্যান্য দলের প্রার্থী।
এবারের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন। ৩০০ আসনের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সঙ্গে। নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলো মনে করছে, এখন পর্যন্ত নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট হওয়ার মতো বিষয়গুলোর উপস্থিতি তেমনভাবে দেখা যায়নি। ফলে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও এখনো নির্বাচনের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রয়েছে।
দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে একধরনের ঠাণ্ডা লড়াই চলছে। কারণ তারা বেশির ভাগই সরকারি দলের। তারা সবাই চাইবে নির্বাচনি মাঠ দখলের। এ জন্য তারা প্রশাসনকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করতে চাইবে। তাই মাঠ প্রশাসনে নির্বাচনের দায়িত্বে যারা রয়েছেন, তাদের সবাইকে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ আরপিও মেনে চলতে হবে। নির্বাচনি পরিবেশ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ রাখাই মাঠ প্রশাসনের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে ৩ জানুয়ারি থেকে সেনাবাহিনী মাঠে রয়েছে। অবশ্য শুক্রবার রাতে রাজধানীর গোপীবাগ এলাকায় বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নির্বাচনের দুই দিন আগে এ ধরনের ঘটনা এবং শনিবার ও ভোটের দিন বিএনপির হরতাল ডাকা ভোটারের উপস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এবারের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এবারের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্বাচন নিয়ে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে বিরোধী দলগুলোর নির্বাচন বয়কট ও আন্দোলন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং নির্বাচন নিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের বক্তব্য নিয়েও সমালোচনা কম ছিল না। ক্ষমতাসীন দল এসব নিয়ে বেশ বিব্রত ছিল।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে নির্বাচন কমিশন বারবার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। তারা তাদের দায়িত্ব আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করবে। ভোট জালিয়াতি, ব্যালট ছিনতাই, ভোট কারচুপি, পেশিশক্তির ব্যবহার একটি সুষ্ঠু নির্বাচনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে চেষ্টা করে। সংঘাত ও সহিংসতার দিকে নিয়ে যায়। এগুলো শক্ত হাতে প্রতিহত করতে হবে। অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ উৎসবমুখর নির্বাচনের জন্য অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ কাম্য। রাজনৈতিক হানাহানি, প্রতিহিংসা পরিহার করে সাধারণ জনগণ নির্ভয়ে আনন্দমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে তাদের মূল্যবান ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, সেই পরিবেশ নির্বাচন কমিশনকে করে দিতে হবে।
সহিংসতা-নাশকতা কখনো দেশের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। উৎসব ও আনন্দমুখর পরিবেশে মানুষ তার নাগরিক অধিকার ‘ভোট’ প্রদান করবে। গণতান্ত্রিক ধারায় দেশ পরিচালিত হবে। করোনা-পরবর্তী সাধারণ জনগণ এমনিতেই নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় তারা আর থাকতে চায় না। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কমিয়ে আনার সহজ উপায় হলো একটা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।
সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই এখন মুখ্য বিষয়। এ ক্ষেত্রে সরকার ও নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল এবং নির্বাচন কমিশনের আন্তরিক প্রচেষ্টায় একটি ভালো নির্বাচন সম্পন্ন হবে, সেটিই কাম্য।