দেশে পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১০ সালে আবাসিকে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধের পর থেকে বাসাবাড়িতে এলপি গ্যাসের ব্যবহার বাড়তে থাকে। কয়েক বছর ধরে গ্যাসসংকটের কারণে পাইপলাইনে গ্যাসের গ্রাহকদের অনেকেই এলপিজি ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন। সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবহার বাড়লেও বাড়েনি জনসচেতনতা। সিলিন্ডার ব্যবস্থাপনার বেহাল দশার কারণে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডগুলো ঘটছে বলে অনেকেই মনে করছেন। তদারকি ও জনসচেতনতার অভাবে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে প্রাণহানি। গত আড়াই মাসে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে আগুন লেগে মৃত্যু হয়েছে অর্ধশতাধিক মানুষের। নিয়ম না মেনে যত্রতত্র গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের কারণে বেইলি রোডের ভবনে অগ্নিকাণ্ড ভয়াবহ রূপ ধারণ করে বলে মনে করে ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
সম্প্রতি বেইলি রোডের আগুনের ঘটনায় ৪৬ জন মারা যান। বেইলি রোডের আগুনের ঘটনার পরপরই দেশে আরও কয়েকটি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গাজীপুরে গ্যাস সিলিন্ডারের আগুনে দগ্ধ হয়েছেন অন্তত ৪০ জন। এতে এখন পর্যন্ত শিশুসহ ১১ জন মারা গেছেন।
সূত্রমতে, দেশে প্রায় ৯০ লাখ সিলিন্ডার ব্যবহারকারী আছেন। আর মোট সিলিন্ডারের সংখ্যা সাড়ে ৩ কোটি। এসব সিলিন্ডার বাজারজাত করে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৩০টি প্রতিষ্ঠান। পরিবহনদূষণ কমাতে ২০০০ সালে দেশে যানবাহনে গ্যাসের ব্যবহার এবং রান্নার কাজে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের ব্যবহার শুরু হয় ২০০৫ সালের দিকে। তারপর থেকে সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবহার বাড়লেও সিলিন্ডার ব্যবস্থাপনা সেই অর্থে গড়ে ওঠেনি। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২৩ সালে চুলার গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ২১০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ সালে ছিল ৯৪টি। এর আগের বছরগুলোতে এ পরিসংখ্যান ছিল উদ্বেগজনক। প্রতিষ্ঠানটির মতে, তদারকি না বাড়ালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।
গ্যাস সিলিন্ডার যেভাবে পরিবহন করার কথা, সেভাবে ব্যবহার বা মজুত হচ্ছে না। নিয়ম বা বিধি না মানার কারণে দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাশের দেশ ভারতে বাসাবাড়িতে ব্যবহারের জন্য বিপুল পরিমাণে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহৃত হলেও বিস্ফোরণের মতো দুর্ঘটনা ঘটে খুবই কম। কারণ সেখানে সিলিন্ডার ও এর যন্ত্রাংশের মান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সিলিন্ডার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তারা যথেষ্ট সচেতন। কিন্তু বাংলাদেশের সিলিন্ডার ব্যবহারকারীদের মধ্যে এ ধরনের সচেতনতাবোধ এখনো জাগ্রত হয়নি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক এবং জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ২ শতাংশ এলপি গ্যাস ও ৫ শতাংশ লাইনের প্রাকৃতিক গ্যাস বাতাসের সংস্পর্শে এলেই তা ভাসতে থাকে এবং একপর্যায়ে তা বিস্ফোরণ থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে। তাই মানসম্মত সিলিন্ডার ব্যবহারের বিকল্প নেই। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। তদারকিও বাড়াতে হবে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে।
ঢাকার অলিগলিতে অনুমোদন ছাড়াই ঝুঁকি নিয়ে সিলিন্ডারে গ্যাস ভরে তা বিক্রি করছেন অনেকে। অনেক স্থানে মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারে রং করে নতুন বলে তা বিক্রি করা হচ্ছে। এর ব্যবহার রোধকল্পে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে তদারকি বাড়াতে হবে। মানসম্মত সিলিন্ডারের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং সিলিন্ডারের সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য পরিদর্শন বাড়াতে হবে। সাধারণ মানুষের জীবনহানি যাতে না ঘটে এবং এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে যাতে না পড়তে হয়, সে জন্য জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।