করোনা মহামারি ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ চাপে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে তিন কারণে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি হচ্ছে। এগুলো হলো টাকার অবমূল্যায়ন, ডলারসংকটে আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানিসংকট ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি। চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কম হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ওয়াশিংটনভিত্তিক ঋণদানকারী সংস্থাটি বলেছে, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৫.৬ শতাংশ। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে বলে মনে করে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্টের প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস এক সম্মেলনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। সরকার চলতি অর্থবছরের সংশোধিত জিডিপির যে লক্ষ্যমাত্রা প্রাক্কলন করেছে, তার চেয়ে আরও কম হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। চলতি অর্থবছরে সরকার সংশোধিত জিডিপির লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করেছে সাড়ে ৬ শতাংশ। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ডিরেক্টর আব্দুল্লায়ে সেক।
আব্দুল্লায়ে সেক বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা আছে। তবে কোনো সন্দেহ নেই এ দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। কিন্তু মজুরি অনেকটা এক জায়গায় আটকে আছে। এতে অনেক নিম্ন আয়ের পরিবার চাপের মুখে আছে। এ ছাড়া আর্থিক খাতেও নানা ধরনের ঝুঁকি আছে।
প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলেছে, কোভিড-১৯ মহামারি থেকে প্রত্যাবর্তনে বাংলাদেশের অর্থনীতি শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতি, লেনদেনের ভারসাম্যে ঘাটতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে মহামারি-পরবর্তী কার্যক্রম পুনরুদ্ধার ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশে কিছু নীতির উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। যেমন- জ্বালানি খাতে সংস্কার। রপ্তানিতে ভর্তুকি কমানো এবং মুদ্রানীতি কঠোর করা হয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছে সংস্থাটি। কিছু ক্ষেত্রে সংস্কার বেগবান করার কথা বলেছে। এর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার শিথিল করা, মুদ্রা ও রাজস্বনীতি আরও কার্যকর করা। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুসারে গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃত্তি হয়েছে ৫.৮%, ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবৃত্তি হয়েছে ৭.১%।
অর্থাৎ তাদের হিসাবে ২০২১-২২ অর্থবছরের পর টানা দুই অর্থবছর দেশের প্রবৃদ্ধির হার কমে ৬ শতাংশের নিচে নামতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূতকরণের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকা দরকার। সম্পদের মান ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে ব্যাংক একীভূত করা উচিত বলে মনে করে প্রতিষ্ঠানটি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির হ্রাস আরও টেনে ধরা দরকার বলেও তারা অভিমত দেয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ কমাতে আর্থিক সংস্কার ও মুদ্রার একক বিনিময় হার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা জরুরি। অর্থনীতির বৈচিত্র্য এবং অর্থনীতির মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদে স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা বৃদ্ধিতে কাঠামোগত সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ।
জিডিপির প্রবৃত্তি বাড়াতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে জোর দিতে হবে। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শগুলো মেনে সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে। অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ এবং বিশ্বব্যাংকের আগাম পূর্বাভাসকে মাথায় নিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে সরকারকে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে। তাহলে দেশে অর্থনীতির গতিশীলতা ফিরে আসবে। প্রবৃত্তি বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।