ডেঙ্গু ভাইরাসের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগে রয়েছেন দেশের বিজ্ঞানীরা। গত বছর দেশের ইতিহাসে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং মারা গেছেন। দেশে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ শনাক্ত হয়েছে। এ বছর আগের বছরের তুলনায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সময়সীমা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি চিন্তার উদ্রেক ঘটিয়েছে বিশেষজ্ঞদের। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঢাকার চেয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এ বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি হওয়ার ঘটনা।
এমন উদ্বেগ থেকেই ডেঙ্গুর সব সেরোটাইপ, জেনোটাইপ নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে কোনো কোনো গবেষণাগারে। সিকোয়েন্সিংয়ে জোর দিয়েছেন কেউ কেউ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছর যারা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বেঁচে গেছেন, এবারও তারা আক্রান্ত হলে বিপদ বাড়বে। ফলে গতবার আক্রান্ত হওয়া রোগীদের এবার অধিকতর সতর্ক থাকা জরুরি। গত বছর আক্রান্তদের মধ্যে বেশি ছিল সেরোটাইপ-২-এর। এর বাইরে গত বছর দুটি সেরোটাইপের একটি সম্মিলিত অংশও ছিল। এ ক্ষেত্রে রোগতত্ত্ববিদরা বলছেন, পাশের দেশ ভারতে ইতোমধ্যেই ডেন ফাইভ সেরোটাইপ শনাক্ত হয়েছে। বাংলাদেশে ডেন-৫ শনাক্ত হলে পরিস্থিতি নিশ্চিতভাবেই গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি মারাত্মক হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, গত বছর ৩ লাখ ১৬ হাজার ৪৮৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং মারা গেছেন ১ হাজার ৬৭৮ জন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৫৮১ এবং মারা গেছেন ৩৩ জন। গত দুই দিনের তথ্যানুসারে, শেষ ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১২ জন এবং মারা গেছেন একজন। এবার আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম বিভাগে ৭৭১ জন এবং এর পরই ঢাকা দক্ষিণে ৫০৩। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে বরিশাল অঞ্চলে এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি।
ডেঙ্গু চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ইমেরিটাস অধ্যাপক ডাক্তার এ বি এম আব্দুল্লাহ খবরের কাগজকে বলেন, গত বছরের অভিজ্ঞতা অনুসারে এবার জরুরি ভিত্তিতে নতুন সেরোটাইপ আছে কি না, সেটি দেখা দরকার। যত পরীক্ষা হবে তত সহজে সেরোটাইপ শনাক্ত সহজ হবে। আশপাশের দেশে থাকলে সেটি আমাদের জন্য আরও শঙ্কার ব্যাপার। সেদিকে নজর রেখেই আমাদের বিজ্ঞানীরা কাজ শুরু করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছর যারা যে সেরোটাইপে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তারা এবার আক্রান্ত হলে বুঝতে হবে অন্য কোনো সেরোটাইপ তাদের আক্রান্ত করেছে। ফলে তাদের জটিলতা ও ঝুঁকি বেশি থাকবে। তাদের বেশি সতর্ক থাকতে হবে। কোন এলাকায় কোন সেরোটাইপ বেশি, সেটি জানলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসার কাজ সহজ হবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের উপনির্বাহী পরিচালক ড. সেজুতি সাহা খবরের কাগজকে বলেন, গত বছর দেশে ডেঙ্গুর যে পরিস্থিতি হয়েছিল, তাতে এবারও সবাইকে সতর্ক থাকা দরকার। এ ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর গতিপ্রকৃতি নিয়ে কাজ করাও জরুরি। সেদিকে নজর রেখেই আমাদের প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই ডেঙ্গুর সেরোটাইপ সিকুয়েন্সিংয়ের কাজ শুরু করেছে। কারণ অনেক সময়েই এক সেরোটাইপের মধ্যে জেনোটাইপগুলোর নতুনত্ব আসতে পারে। যেমনটি আমরা করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে দেখেছি।
অনেক সাব-ভেরিয়েন্ট হঠাৎ করে বড় ও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শেষ নেই। আগে কেবল পরিষ্কার পানিতে ও ঘরেই ডেঙ্গু এডিসের প্রজনন হতো। এখন নোংরা পানিতে নালা-নর্দমায়ও এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। এটিও দুশ্চিন্তার বিষয়। কোন এলাকায় সেরোটাইপ বেশি, সেটি জানলে চিকিৎসার কাজ সহজ হবে। সার্বক্ষণিক সেরোটাইপ পর্যালোচনা করতে হবে। ডেঙ্গুর গতিপ্রকৃতি নিয়ে গবেষণা আরও বাড়াতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু প্রতিরোধে জনসচেতনতা আরও বাড়াতে হবে।