ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আবারও সংঘাত হয়েছে। গত রবিবার প্রায় সারা রাত ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের কেন্দ্রস্থল ছিল রাজধানীর নিউ মার্কেট থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশমুখ- ‘গণতন্ত্র তোরণে’র ভেতর পর্যন্ত। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, সংঘর্ষে উভয় পক্ষের ১০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও উদ্বেগজনক। সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা মাঝে মাঝে বিরতি দিয়ে অনেক দিন ধরে এই আন্দোলন করছেন। কিন্তু এবারই প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা মুখোমুখি রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন।
রবিবার রাতের সংঘর্ষের সূচনা হয় একটা সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে। সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তারা তাদের ৫ দফা দাবি জানাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মামুন আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি শিক্ষার্থীদের ‘অপমান’ করেন। শিক্ষার্থীরা এই অপমানের জন্য অধ্যাপক মামুনকে ‘দুঃখ প্রকাশ’ করার অনুরোধ জানান। কিন্তু তিনি দুঃখ প্রকাশে বিলম্ব করলে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও হলগুলো থেকে নেমে এসে পাল্টা বিক্ষোভ শুরু করেন। উভয় পক্ষের মধ্যে বেধে যায় সংঘর্ষ। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মধ্য দিয়ে সেই সংঘর্ষ চলে ভোররাত পর্যন্ত।
পরদিন সোমবার সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তারা পূর্বের ৫ দফা দাবির সঙ্গে সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মামুন আহমেদের ‘পদত্যাগে’র দাবি জুড়ে দেন। শিক্ষার্থীদের ৫ দফা দাবিগুলো ছিল ২০২৪-২৫ সেশন থেকেই সাত কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় অযৌক্তিক কোটা পদ্ধতি বাতিল করা, শ্রেণিকক্ষের ধারণক্ষমতার বাইরে শিক্ষার্থী ভর্তি না করা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা, ভর্তি পরীক্ষায় ভুল উত্তরের জন্য নম্বর না কাটা এবং সাত কলেজের ভর্তি ফির স্বচ্ছতা নিশ্চিতে মন্ত্রণালয় গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া নতুন অ্যাকাউন্টে ভর্তি ফি জমা রাখা। এবারই প্রথম নয়, প্রায় আট বছর ধরে এই কলেজের শিক্ষার্থীরা এসব দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। এই আন্দোলনকে ঘিরে ইতোপূর্বে যৌন নিগ্রহ, উপাচার্য আক্রান্ত, প্রক্টর ঘেরাও, মিছিল, বিক্ষোভ, ফটকে তালা, ছাত্রলীগের হামলার মতো ঘটনাও ঘটেছে। রবিবার রাতে এই সংঘাত ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
সমস্যা সমাধানে সোমবারই উদ্যোগী হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান। তিনি সাত কলেজের অধ্যক্ষদের সঙ্গে জরুরি সভায় মিলিত হন। সেই সভায় সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘সম্মানজনক পৃথকীকরণে’র সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই সঙ্গে সুপারিশ করা হয় যে, সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের পরবর্তী শিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়গুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেখবে।
সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে তাদের দাবিগুলো জানিয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের সেসব দাবির প্রেক্ষাপটে ‘পৃথকীকরণে’র পথ বেছে নিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর শিক্ষার্থীরা যে চাপ প্রয়োগ করে আসছিল তা থেকে তারা মুক্ত হলো। কিন্তু শিক্ষার্থীরা যে দাবিগুলো জানিয়েছে, সেসব সমস্যার সমাধান এতে হবে না। কারণ, সেই সমস্যাগুলো মূলত একাডেমিক সমস্যা। শ্রেণিকক্ষের ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করে কলেজগুলো। একটা শ্রেণিতে যেখানে ৫০-৬০ জন বসতে পারেন, সেখানে কখনো কখনো ভর্তি করে শতাধিক। শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাতও আদর্শ অনুপাতের (১:২০) চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। শিক্ষকের অভাব, প্রয়োজনীয়সংখ্যক ক্লাস না হওয়া, পরীক্ষা না হওয়া, পরীক্ষাগারের সংকট, সেশনজট ইত্যাদি নানা সমস্যায় জর্জরিত আমাদের কলেজগুলো।
কীভাবে এসব সমস্যার সমাধান হবে, সে সম্পর্কে আসলে ব্যাপক পরিকল্পনা ও তা কার্যকর করার পদক্ষেপ নিতে হবে। কিন্তু সেখানেও যে সমস্যা রয়েছে, এই মুহূর্তে সেসব প্রায় অনতিক্রম্যই বলা যায়। বিগত একাধিক সরকার ‘রাজনৈতিক’ কারণে সারা দেশের সরকারি কলেজগুলোতে একের পর এক সম্মান ও মাস্টার্স প্রোগ্রাম চালু করেছে। যথাযথ অবকাঠামো ও শিক্ষক আছে কি না ভাবেনি। এক দশক আগে সরকারি কলেজগুলোর নৈরাজ্য যখন চরমে, মান যখন নিম্নগামী, একধরনের অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়, তখন সরকারের অনুরোধে ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকার সাতটি কলেজকে অধিভুক্ত করে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই একাডেমিক দায়িত্ব নেওয়ার সক্ষমতা আছে কি না, ভেবে দেখেনি। এমনিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে নিজেই নানা সমস্যায় আক্রান্ত। এর ওপর বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে থাকা সরকারি কলেজগুলোর সম্মান ও মাস্টার্সের অধিকাংশ একাডেমিক দায়িত্ব নেওয়ার শিক্ষাগত ও প্রশাসনিক সক্ষমতা তার ছিল না। মাত্র আট বছরের মাথায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেটা প্রমাণিত হলো।
আপাতত শিক্ষার্থীদের এখনকার আন্দোলন হয়তো থেমে যাবে। কিন্তু যে সমস্যাগুলোর কথা বলা হলো সেসব সমস্যার সমাধান হবে না। এসব সমস্যার সমাধান করতে হলে একাধিক স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের দরকার হবে। শিক্ষার্থীরা অবশ্য একটা দাবি জানিয়ে আসছেন, ‘স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে’র দাবি। ইতোমধ্যে তীতুমীর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে সেই দাবি আদায় করে নিয়েছেন। অন্য কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা এখন সেটা চাইতে পারেন। স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় হলেও সমস্যার সমাধান হতে পারে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন হবে বিপুল পরিমাণ বাজেট ও পরিকল্পনার। আদৌ সেটা করা সংগত হবে কি না বা করা যাবে কি না, সেসব নিয়ে সরকারি পর্যায়ে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।
মূল বিষয়টি যদি হয় শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা, তাহলে এসব নিয়ে ভাবতে হবে। পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে সেসব করা সম্ভব হবে কি না, বলা কঠিন। তবে যে সরকারই হোক, এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে। বিশেষ করে এই ছয় (তিতুমীর কলেজ ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় হবে বলে সরকার ঘোষণা করেছে) কলেজের ক্ষেত্রে। আমরা মনে করি, বর্তমান সরকার কাজগুলো সূচনা করে যেতে পারে। একটা শিক্ষা কমিশন গঠন করে কলেজগুলোর সুদূরপ্রসারী দূরদর্শী একাডেমিক সমস্যার সমাধান করার জন্য সরকারের প্রতি আমরা আহ্বান জানাচ্ছি। সেটাই হবে স্থায়ী সমাধান।