আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বাড়ছে। এমন কিছু বিধানের প্রস্তাব করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। খসড়া আকারে ইসি এই প্রস্তাব সরকারের অনুমোদনের জন্য পাঠাবে। অনুমোদন পেলে তা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ২০২৫-এর অন্তর্ভুক্ত হবে। গত পরশু কমিশনের নবম বৈঠকের আলোচ্য বিষয় ছিল এই গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ (আরপিও সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫; রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫-সহ বেশ কিছু বিধান।
সংশোধিত এই খসড়া এবং নীতিমালা অনুসারে সংসদ নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো ‘না’ ভোটের বিধান ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। যদি কোনো আসনে একজন প্রার্থী থাকে, তাহলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে পারবেন না। প্রার্থীকে ‘না’ ভোটের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। যদি ‘না’ ভোট বেশি হয়, তাহলে সেই আসনে পুনরায় ভোটের প্রস্তাব করা হয়েছে। লটারির পরিবর্তে আবার ভোট গ্রহণ হবে।
তবে ভোটারদের জন্য এই ব্যবস্থার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকে আরও নানা দিক থেকে ক্ষমতায়িত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাব অনুসারে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ করা হবে না। এতে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ সব নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাবে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেটি হলো ইসির ভোটের ফলাফল বাতিলের ক্ষমতা পুনর্বহাল করা হয়েছে। ফলে নির্বাচনে ভোট গ্রহণের দিন কোনো কেন্দ্র এবং আসনে অনিয়ম হলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র শুধু নয়, ওই আসনের ভোট বাতিল করতে পারবে ইসি। প্রার্থীদের হলফনামায় দেওয়া তথ্য মিথ্যা প্রমাণিত হলে ওই প্রার্থীরা নির্বাচিত হওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে নির্বাচন কমিশন। এমনকি তার এমপি পদও বাতিল করতে পারবে ইসি।
নির্বাচনের সঙ্গে সংযুক্ত কর্মচারী-কর্মকর্তাদের আরও জবাবদিহির আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে এই খসড়ায়। নির্বাচন কর্মকর্তারা দায়িত্বে অবহেলা করলে তদন্ত সাপেক্ষে শাস্তি পাবেন। প্রার্থীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে। প্রার্থীরা কোনো ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান নিতে পারবেন। তবে সেটা নিতে হবে ব্যাংকের মাধ্যমে। নির্বাচন কমিশনের নবম সভায় এ রকম একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবগুলো আগামী সপ্তাহে সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে ইসি।
আমরা ইসি গৃহীত উল্লিখিত প্রস্তাবগুলোকে স্বাগত জানাই। স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি ছিল। তবে ‘না’ ভোটের বিধানটি একক প্রার্থী থাকলে শুধু নয়, একাধিক প্রার্থীর ক্ষেত্রে আগের মতো ‘ওপরের কাউকে নয়’ ভোটের বিধান রাখা যেত। অর্থাৎ একজন ভোটারের কাছে নির্দিষ্ট কেন্দ্রের কোনো প্রার্থীকে যদি যোগ্য মনে না হয়, তাহলে সেই ভোটারের অপছন্দের বিষয়টি জানানোর ব্যবস্থা থাকলে প্রার্থী নির্বাচনের বিষয়টি আরও স্বচ্ছ হতে পারত। ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ না করার দাবি অনেক দিনের। এটি স্বচ্ছ ও সহজ পদ্ধতি নয়। এই পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণের ব্যবস্থাটি বাতিল হওয়ায় ফলাফলে প্রযুক্তিগত কারচুপির সম্ভাবনা লুপ্ত হলো। আমরা মনে করি সিদ্ধান্তটি সঠিক।
তবে ভোটের ফলাফল বাতিলের ক্ষমতা ইসি পেলে নির্বাচন আরও গ্রহণযোগ্য হবে। সরকার নিশ্চয়ই এই প্রস্তাবটি অনুমোদন করবে। কারণ, নির্বাচনের পূর্ণ কর্তৃত্ব থাকা উচিত নির্বাচন কমিশনের। তারাই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে যদি ফলাফল বাতিল করে, তাহলে নির্বাচনে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত হবে।
নির্বাচনের কাজে নিযুক্ত কর্মকর্তা ও কর্মকর্তাদের শাস্তির আওতায় আনাও যথার্থ সিদ্ধান্ত বলে আমরা মনে করি। এতে তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। পক্ষপাতহীন সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এটা জরুরি ছিল। সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২ (সংশোধন)-এর একগুচ্ছ প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠাচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত নির্বাচনব্যবস্থাকে জোরদার করবে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস কয়েক দফায় দেশে-বিদেশে বলেছেন তার সরকার সর্বকালের একটা সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ নির্বাচনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুসারে আরপিও সংশোধিত হলে এর অনেকটাই পূরণ হবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশের মানুষ আসলে এ রকম একটি নির্বাচনের অপেক্ষায় আছে।