বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আট বছর পূর্তি হবে আগামী ২৫ আগস্ট। মায়ানমার সেনাবাহিনীর হাত থেকে প্রাণে বাঁচতে ২০১৭ সালের এই দিনে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে। সেই থেকে অব্যাহত রয়েছে এই অনুপ্রবেশ। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর সংখ্যা ১৪ লাখেরও বেশি। সময় অনেক গড়ালেও রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হয়নি; বরং আরও জটিল হয়েছে। প্রথমে কোভিড মহামারি, পরে মায়ানমারে সামরিক শাসন এবং আরাকান আর্মির আরাকান রাজ্য দখলের ডামাডোলে রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক মনোযোগ হারিয়েছে। কমেছে আন্তর্জাতিক সাহায্য। এই প্রেক্ষাপটে একটা ভালো খবর আমাদের কাছে এসেছে। তা হলো, নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ এবং সাহায্য প্রাপ্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ সম্মেলনের আয়োজক জাতিসংঘ, কাতার ও বাংলাদেশ। এই উদ্যোগ আগামী চার মাসে তিন পর্যায়ে দেখা যাবে। রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে এ সময় তিনটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন হবে।
‘অংশীজন সংলাপ: রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে আলোচনার জন্য প্রাপ্ত বার্তা’ শীর্ষক প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২৫ আগস্ট, কক্সবাজারে। এর পরের উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন হবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ৩০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে। তৃতীয় সম্মেলন হবে ৬ ডিসেম্বর কাতারের দোহায়। ধারাবাহিক এই গুচ্ছ সম্মেলনের লক্ষ্য হচ্ছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য তহবিল বাড়ানো আর তাদের ফেরত পাঠানোকে জোরদার ও নিশ্চিত করা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, কক্সবাজারে প্রথম যে সম্মেলন হবে; সেটি হবে তিন দিনের। এতে পাঁচটি কর্ম-অধিবেশন থাকবে। আলোচনার বিষয় হিসেবে থাকছে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা এবং রাখাইনে ফেরত পাঠানো। রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে বৈশ্বিক যে মনোযোগ হারিয়ে গিয়েছিল, এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আবার যুক্ত করা হচ্ছে। আর্থিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারেও ফিরিয়ে আনা হবে তাদের। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ৯টি দেশ এবং ঢাকায় অবস্থিত সব কূটনৈতিক মিশন, এনজিওসহ সংশ্লিষ্ট দাতা সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কক্সবাজারে আলোচনার ভিত্তিতে এমন একটি দলিল প্রণয়ন করা হবে, যার ভিত্তিতে নিউইয়র্ক সম্মেলনে ‘অবস্থানপত্র’ তৈরি করা হবে। এই দলিলটিই পরে দোহার রোহিঙ্গা-সম্পর্কিত উচ্চ পর্যায়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থাপিত এবং আলোচিত হবে। আমরা এই গুচ্ছ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।
আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্য দখল করার পর আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় রোহিঙ্গা সংকট তীব্রতর হয়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা প্রায় লুপ্ত হয়ে গেছে। শুধু তা-ই নয়, কিছুদিন ধরে নাফ নদী থেকে যেভাবে মায়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) বাংলাদেশের জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর আসছে, তাতে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের আশাও ক্ষীণ হয়ে আসছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সমস্যা মানবিক সমস্যা। সমস্যাটি বাংলাদেশ-মায়ানমারের দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়, এটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন থেকে বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে দিন কাটাচ্ছে। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হওয়া প্রয়োজন। মায়ানমার মানবতাবিরোধী অপরাধ, জেনোসাইড এবং জাতিগত নির্মূলের মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। প্রায় পাঁচ বছর আগে তখনকার অবসরপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রসচিব এবং এই সময়ের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন একটা পত্রিকায় লিখেছিলেন, ‘মায়ানমারের সেনা, পুলিশ ও স্থানীয় বৌদ্ধ চরমপন্থিদের হাতে অন্তত ২৪ হাজার অসামরিক রোহিঙ্গা নিহত হয়। ১৮ হাজার রোহিঙ্গা নারী বা বালিকা ধর্ষণের শিকার হয়।… রোহিঙ্গা সমস্যার একমাত্র সমাধান নিরাপত্তা এবং অধিকারসহ তাদের নিজ বাসভূমে ফিরে যেতে দেওয়া।’ কিন্তু ‘এ ক্ষেত্রে সামান্যতমও অগ্রগতি হয়নি’।
এখন সমাধানের সুযোগ এসেছে অথবা সুযোগ সৃষ্টি করার জোরালো ভূমিকা নিতে হবে, যাতে এই সংকটের সমাধান করা যায়। পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে আগে তার লেখায় যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন আর সমাধানের পথনির্দেশ দিয়েছিলেন, বাংলাদেশ সেদিকেই অগ্রসর হচ্ছে। তবে এখন দরকার, তৌহিদ হোসেনের কথা অনুসারে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি পশ্চিমের দেশগুলোকে মায়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টিতে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে উদ্বুদ্ধ করা। কক্সবাজার সম্মেলন থেকে নতুন করে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের সূচনা ঘটুক। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করবে বলে আমরা আশা করছি।