দেশে সাধারণ মানুষের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা এবং জীবনযাত্রার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) প্রতিবেদন আকারে একটা জরিপের ফলাফল প্রকাশ করেছে। গত সোমবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘ইকোনমিক ডায়নামিকস অ্যান্ড মুড অ্যাট হাউসহোল্ড লেভেল ইন মিড ২০২৫’। গত মে মাসে দেশের ৮ হাজার ৬৭টি পরিবারের ৩৩ হাজার ২০৭ জনের মতামতের ভিত্তিতে গবেষণাটি করা হয়। এতে সাধারণ মানুষের আয়-ব্যয়ের যে চিত্র উঠে এসেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, আগের তুলনায় সাধারণ মানুষ আরও বেশি অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন।
বাংলাদেশে গত তিন দশক ধরে দারিদ্র্যের হার হ্রাস পাচ্ছিল। কিন্তু এখন তা ক্রমেই বাড়ছে। সেই সঙ্গে গত তিন বছরে বেড়েছে অতিদরিদ্রের হার। গবেষণায় বলা হয়, গত মে মাসে দারিদ্র্যের হার এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮ শতাংশে। এই হার সরকারি হিসাবে ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে দারিদ্র্যের হার প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, গত তিন বছরে অতিদরিদ্রের হারও বেড়েছে। ২০২২ সালে অতি দরিদ্রের হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ; বৃদ্ধির হার প্রায় ৪ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জনশুমারির প্রেক্ষাপটে দেশে এখন কমপক্ষে পৌনে পাঁচ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। অতিদরিদ্রের এই হার বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
শুধু তাই নয়, দরিদ্রের বাইরে এখন ১৮ শতাংশ পরিবার আকস্মিক কোনো দুর্যোগে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। গবেষণায় পাঁচ ধরনের ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। এসব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী রোগের বোঝা, নারীপ্রধান পরিবারগুলোর নিচের দিকে নেমে যাওয়া, ঋণের জালে জড়িয়ে পড়া, দরিদ্র মানুষের কারও কখনো অভুক্ত থাকা, নন-স্যানিটারি টয়লেট ব্যবহার করার সমস্যা, সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের সংকটকে তীব্র করে তুলেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, তিন বছরের ব্যবধানে শহরের পরিবারের মাসিক ব্যয় কমে গেছে, কিন্তু বেড়েছে খরচ। আগে ২০২২ সালে যেখানে এই আয় ছিল গড়ে ৪৫ হাজার ৫৭৮ টাকা, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৫৭৮ টাকায়। পক্ষান্তরে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার টাকায়। আয়-ব্যয়ের এই ব্যবধান মেটাতে শহরের মানুষ হয় ধার-দেনা করছেন অথবা সঞ্চয় ভেঙে চলছেন। শহরের তুলনায় গ্রামের পরিবারগুলোর গড় আয় সামান্য বেড়েছে; কিন্তু ব্যয়ও খুব কাছাকাছি রয়ে গেছে।
সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি সংকটে আছে খাবারের খরচ নিয়ে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, গরিব পরিবারগুলো যেমন আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি করছে, তেমনি মধ্যবিত্তদেরও আয়ের চেয়ে ব্যয় হচ্ছে বেশি। সবারই এই ব্যয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে খাদ্যে। এর পরিমাণ মোট খরচের প্রায় ৫৫ শতাংশ। শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়ও দ্রুত বেড়েছে। গবেষণায় বলা হচ্ছে, ৪৪ শতাংশ মানুষ ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছেন।
জীবনযাপনের অন্য সূচকগুলোও ইতিবাচক নয়। ঘুষ কমেছে কিন্তু তা বন্ধ হয়নি। সামাজিক সুরক্ষা খাতও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, ২৪ শতাংশ মানুষ সরকারের বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা ভোগ করছেন। এদের মধ্যে প্রায় ১৭ শতাংশ দরিদ্র না হয়েও এই সুবিধা পাচ্ছেন। দেশে যেখানে দরিদ্ররা সবচেয়ে বেশি সংকটে আছেন, সেখানে দরিদ্র নয় এমন মানুষের দরিদ্রদের সুরক্ষা পাওয়াটা বড় ধরনের দুর্নীতি বলে ভাববার অবকাশ থেকে যায়। দরিদ্রদের সুবিধা যাতে দরিদ্ররা পায়, সরকারকে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে, পুরো ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে পৌনে পাঁচ কোটি হতদরিদ্র মানুষসহ পুরোটাই শুধু দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দ থাকা জরুরি।
এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের অভাবে দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাচ্ছে; আয় কমে গেছে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান না বাড়ালে দারিদ্র্য আরও বাড়বে। এ জন্য জরুরি হচ্ছে বিনিয়োগ যাতে বাড়ে সেই ব্যবস্থা করা। ব্যবসা-বাণিজ্যে যত বাধা আছে তা দূর করা। সরকার দেশের আর্থব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু পরিবেশ বিনিয়োগবান্ধব না হওয়ায় কর্মসংস্থান বাড়ছে না। সরকারের দারিদ্র্য রোধের উদ্যোগ কম। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পারছে না। তারা বলছেন, রাজনীতি ও ব্যবসাকে আলাদা রেখে ব্যবসা ও বিনিয়োগের খাতকে স্বাভাবিক গতিতে চলতে দেওয়াই হবে বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের একটা বড় উপায়। সরকারের এদিকে নজর দিতে হবে।
পিপিআরসির এই জরিপ- সরকারের এখন কী করণীয়, তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। সব মিলিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা এবং জীবনযাত্রার বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সরকারের জন্য নতুন কর্মকৌশল এবং উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। দ্রুত সরকার এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।