গতকাল ২০২৫ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) এবং সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। দেশের ৯টি সাধারণ ও কারিগরি এবং মাদ্রাসা বোর্ড মিলিয়ে ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫৮ দশমিক ৮৩। এবারের ফলাফলে পাসের হারে সবচেয়ে এগিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৭৫ দশমিক ৬১। এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীন ১২ লাখ ৫১ হাজার ১১১ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেন। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এ বছর পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ১০ লাখ ৪৭ হাজার ২৪২ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে পাস করেছেন ৫ লাখ ৯৮ হাজার ১৬৬ জন।
অন্য সূচকগুলোও এবার ছিল নিম্নমুখী। পরিসংখ্যান বলছে, গত ২১ বছরের মধ্যে এবারই পাসের হার সর্বনিম্ন, অর্থাৎ সবচেয়ে কম শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হলো। সাড়ে ১২ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাড়ে ৪ লাখ। অনুত্তীর্ণ এই শিক্ষার্থীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি সাধারণ শিক্ষায়, বেশ আশঙ্কাজনকই বলা যায়। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের গড় পাসের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ কম। বোঝাই যায়, ধাক্কাটা লেগেছে মূলত সাধারণ শিক্ষায়। গত বছরের সামগ্রিক ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করলে হতাশার চিত্রটা কপালে ভাঁজ ফেলে দেওয়ার মতো।
সব মিলিয়ে এবারের ফলাফলকে তাই ফলাফল বিপর্যয় বলা যায়। শুধু বিপর্যয় বললে সবটা বলা হয় না; একে ধস বলাই সঙ্গত।
কেন এমনটা হলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা সমস্যা কোথায় সেই কারণগুলো খুঁজে দেখবেন নিঃসন্দেহে। গত বছরের জুলাই আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে ফলাফলে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন রাস্তার আন্দোলনে যুক্ত থাকায় তারা শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত ছিলেন না। পাঠ্য কার্যক্রম ও পাঠ্যবইয়ের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক ছিল না। মন না বসলে যে পড়াশোনা হয় না, সেই অভিজ্ঞতা আমাদের সবারই আছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল অস্থির। দেশজুড়ে দিনের পর দিন শিক্ষক নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা উগ্রভাব চলে আসে। ফল বিপর্যয়ের পেছনে ক্যারিকুলামেরও ভূমিকা ছিল। একটা ধারায় পড়তে পড়তে যখন সেই ধারাটা গতি পরিবর্তন করে, তখন পরিপূর্ণ স্থিরতা নিয়ে পড়াশোনা করার মানসিকতায় চিড় ধরে। ঘটেছে সেটাও। সেই সঙ্গে সরকার পরিবর্তনের বিষয়টিও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় পরোক্ষ প্রভাব ফেলেছে। আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে একধরনের স্বাধীনতা বা শিক্ষার্থী হিসেবে ক্ষমতায়িত হওয়ার চিন্তা তাদের পড়াশোনা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। যেসব পরীক্ষা হয়ে গেছে তার আলোকে ফলাফল দেওয়ার জন্য সচিবালয়ে গিয়ে দাবি জানিয়েছে তারা। সব মিলিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অস্থির ও অস্থিতিশীল। এতে শিক্ষার্থীরা যে তীব্র মানসিক সংকটের মধ্যদিয়ে গেছেন তা সহজেই অনুমেয়। সরকারও আগে যেমন নম্বর বাড়িয়ে ফলাফল দিত বলে যে অভিযোগ শোনা গেছে, গত বছর এবং এবার সেটা করেনি। শিক্ষার্থীদের যা প্রাপ্য সেই নম্বর তারা পেয়েছে। এটাই হচ্ছে প্রকৃত মূল্যায়ন, ফলাফলে এরই প্রতিফলন ঘটেছে।
বিপর্যয় যা-ই হোক, সমাধান তো বের করতে হবে। উত্তীর্ণ হওয়ার মানদণ্ডে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ধারায় ধরে রাখতে না পারলে সংকট দেখা দেবে নানা ক্ষেত্রে। পরিবারে ও সমাজে অস্থিরতা বাড়বে। অপরাধও বাড়তে পারে।
সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বিষয়টি জানেন। শিক্ষা উপদেষ্টা নিজেই বলেছেন, এই ফলাফল অনেকের কাছে যেমন বিস্ময়ের তেমনি অস্বস্তিকর। সংকট শুরু হয় প্রাথমিক স্তরে। সেখান থেকেই শেখার ঘাটতি তৈরি হয় এবং সেই ঘাটতি বছরের পর বছর সঞ্চিত হতে হতে বিপর্যয় নেমে আসে। এটা মৌলিক সংকট।
আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানও বলেছেন শিক্ষায় গলদ আছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চেহারা বোঝার মতো শিক্ষার অবস্থাটাও তারা বুঝতে পারছেন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
দুজনেই বর্তমান পরিস্থিতি যে ইতিবাচক নয়, সুস্পষ্টভাবে সেকথা বলেছেন। এই বিবেচনা নিঃসন্দেহে ধন্যবাদার্হ। তবে আরও কিছু দিকের প্রতি আমরা তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।
শিক্ষার মানের সঙ্গে শিক্ষকদের বেতন-ভাতার সম্পর্ক গভীর। এই মুহূর্তে বেসরকারি শিক্ষকরা রাজপথে। তাদের দাবি-দাওয়ার বিষয়ে কয়েকটা দিন চলে গেলেও সরকারের কোনো বক্তব্য নেই কেন? সবচেয়ে কম বেতন পাওয়া শিক্ষকদের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষে আছে। শিক্ষাক্ষেত্রে মোট বরাদ্দ পাওয়া দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশের স্থান তলানিতে। সবচেয়ে বড় ভাবনার বিষয় হচ্ছে, এত এত কমিশন হলো, কিন্তু আজও শিক্ষা কমিশন হলো না কেন? এর দায় কী বর্তমান সরকার এড়াতে পারে? আমাদের কথা হচ্ছে, শিক্ষা নিয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। গোড়ায় গলদ বলে শিক্ষা উপদেষ্টা চিহ্নিত করেছেন, তাকে তাই খোলচলচে বদলে ফেলতে না পারলেও মৌলিক কিছু কাজ শুরু করতে হবে। এর মধ্যে প্রথম ও মৌলিক কাজটি হচ্ছে সরকারের মাধ্যমে শিক্ষা কমিশন গঠন করে দেওয়া। তিনি নিজেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষা কমিশনের গুরুত্ব তিনি বিলক্ষণ বোঝেন। আমরা মনে করি এই শিক্ষা কমিশন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শিক্ষার সার্বিক সংকট দূর করার কাজগুলো শুরু হতে পারে।