প্রবন্ধ: বায়ান্নর দিনগুলো
অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন-৮. ‘মানুষের যখন পতন আসে তখন পদে পদে ভুল হতে থাকে।’ কোন প্রসঙ্গে এ কথা বলা হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘বায়ান্নর দিনগুলো’ রচনার এ উক্তিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ভাষা আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার করার পরিবর্তে গুলি করে হত্যার অপকৌশল গ্রহণ প্রসঙ্গে এ কথা বলেছিলেন।
১৯৫২ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে রাজপথে নামে পূর্ব বাংলার ছাত্র-জনতা। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আন্দোলনকারীরা প্রতিবাদ মিছিল বের করে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নির্দেশে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে প্রতিহত করতে এমন ঘৃণ্য অপকৌশল গ্রহণ করলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রতি এ দেশের মানুষের ঘৃণা বাড়তে থাকে। এমন প্রেক্ষাপটে ‘বায়ান্নর দিনগুলো’ রচনায় সে সময়ের রাজবন্দি শেখ মুজিবুর রহমান মনে করেন, পাকিস্তান সরকারের এ ধরনের অপকৌশলই তাদের পতন ত্বরান্বিত করবে। জনবিচ্ছিন্ন কোনো সরকার দমন-নিপীড়ন চালিয়ে টিকে থাকতে পারে না বলেই বঙ্গবন্ধু মুসলিম লীগ সরকার ও দলটি সম্পর্কে এমন ভবিষ্যদ্বাণী করেন এবং তা চরম সত্যে পরিণত হয়। পূর্ব বাংলায় আর কখনো মুসলিম লীগ রাজনৈতিক প্রাধান্য সৃষ্টি করতে পারেনি এবং জনগণের আস্থা পায়নি; যার প্রমাণ ১৯৫৪ ও ১৯৭০ সালের নির্বাচন।
প্রশ্ন-৯. শেখ মুজিবুর রহমানের আব্বার চোখে পানি এসেছিল কেন?
উত্তর: ‘বায়ান্নর দিনগুলো’ রচনা থেকে জানা যায়, কারাগারে পুত্র শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখে তার আব্বার চোখে পানি এসেছিল পুত্রের করুণ শারীরিক অবস্থার কারণে।
অনশন শুরু করার পর থেকে শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন সাহেবের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু নড়াচড়া করার শক্তিও হারিয়ে ফেলেন। নাকে নল লাগিয়ে খাইয়েও তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল না। দিনের পর দিন জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে না খেয়ে থাকতে থাকতে শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে, তাকে দেখে তার আব্বা চোখে পানি ধরে রাখতে পারেননি। পুত্রের মুমূর্ষু অবস্থা দেখার পর বাবার হৃদয়ে জাগ্রত স্নেহ-বাৎসল্যেই বাবা আবেগ ধরে রাখতে না পেরে কেঁদে ফেলেন।
আরো পড়ুন : বায়ান্নর দিনগুলো প্রবন্ধের ৩টি অনুধাবনমূলক প্রশ্নোত্তর, ২য় পর্ব
প্রশ্ন-১০. ‘হাসু আপা, হাসু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি?’ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘বায়ান্নর দিনগুলো’ রচনার উপরোক্ত উক্তিটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র কামাল তার বড় বোন হাসু বা হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিল, হাসিনার মতো তারও ‘আব্বা’ বলে ডাকতে মন চেয়েছিল হাসিনার বাবাকে।
প্রশ্নে উল্লিখিত শিশু কামালের উক্তিতে দীর্ঘদিন না দেখা জন্মদাতা পিতার অচেনা হয়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু যখন কারাবন্দি হিসেবে জেলে যান তখন কামাল কয়েক মাসের শিশু। দীর্ঘ ২৭-২৮ মাস কারাজীবন শেষে বঙ্গবন্ধু বাড়ি ফিরলে কন্যা হাসু তাকে চিনলেও পুত্র কামালের কাছে তিনি অপরিচিতজন। একদিন দুই ভাই-বোন খেলার সময় হাসু কিছুক্ষণ পরপর খেলা রেখে বঙ্গবন্ধুর কাছে এসে ‘আব্বা’, ‘আব্বা’ বলে ডাকছিল। কামাল তৃষ্ণার্ত নয়নে চেয়ে দেখছিল এবং সেও পিতার অভাববোধ করছিল। একপর্যায়ে কামাল তার বড় বোনকে বলল, ‘হাসু আপা, হাসু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি?’ এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলেছিলেন, ‘নিজের ছেলেও অনেকদিন না দেখলে ভুলে যায়।’ বিষয়টি অত্যন্ত আবেগঘন ব্যাপার ছিল।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ঢাকা
কবীর