ব্যবসায়ী মাত্রই হিসাব রাখতে হয়, কিন্তু এক্ষেত্রে সফলতা নির্ভর করে আয়-ব্যয়ের হিসাব দক্ষতার সঙ্গে রাখার ওপর। তাই সফলতার সঙ্গে নিজের ব্যবসা পরিচালনা করতে হলে ব্যবসার আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশল মেনে চলতে হয়।
ব্যক্তিগত খরচ ও ব্যবসায়িক খরচকে আলাদা করুন
একজন পেশাদার ব্যবসায়ী হতে হলে প্রথমেই ব্যক্তিগত খরচ এবং ব্যবসায়িক খরচকে আলাদা করতে হবে। পুরো ব্যবসা আপনার নিজের। কিন্তু ব্যবসার খরচ আপনার নিজের নয়। ওটা ব্যবসার জন্য বিনিয়োগ বা ব্যয় হিসেবে রেকর্ড করতে হবে। একইভাবে আপনার সব ব্যক্তিগত খরচও আপনার নিজের, এটাকে ব্যবসার খরচ হিসেবে রেকর্ড করা যাবে না।
ব্যবসার নির্ভুল আয়-ব্যয়ের হিসাব তখনই পাবেন, যখন ব্যক্তিগত খরচ ও ব্যবসায়িক খরচকে আলাদা করতে পারবেন। এটা না করতে পারলে আপনার ব্যবসার সঠিক আর্থিক চিত্র কখনোই সামনে আসবে না।
বাস্তবসম্মত বাজেট তৈরি করুন
শুধু পণ্য কিনে বিক্রি করাই ব্যবসা নয়। ব্যবসায় আরও নানান পদক্ষেপ নিতে হয়। যেমন- মার্কেটিং, ব্র্যান্ডিং, কমিউনিকেশন, কাস্টমার সাপোর্ট, অফিস পরিচালনা, কর্মী ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। এসব কাজের জন্য দরকার সঠিক কর্মপরিকল্পনা এবং আর্থিক বাজেট। মানে প্রতি বছর বা প্রতি মাসে বা প্রতি সপ্তাহে আপনার ব্যবসার জন্য একটি বাজেট থাকতে হবে। ব্যবসার খরচের জন্য বাস্তবসম্মত একটি বাজেট আপনার ব্যবসা পরিচালনাকে সহজ করবে এবং সঠিক লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
ব্যবসার বাজেট থাকলে আপনি জানবেন, কোন খাতে কত খরচ করা যাবে আর কোন খাতে খরচ কমাতে হবে। এটা জানা না থাকলে ব্যবসার আয়-ব্যয়ের হিসাব সঠিকভাবে করতে পারবেন না। বাজেট আপনার ব্যবসার আর্থিক রোডম্যাপ হিসেবে কাজ করবে।
ব্যবসার বাকি-বকেয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখুন
ব্যবসার অনিয়ন্ত্রিত বকেয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা করুন। কারণ, অনিয়ন্ত্রিত বকেয়া আয়-ব্যয়ের হিসাবকে ভিত্তিহীন করে ফেলতে পারে। মানে আপনার কোনো হিসাবেরই কোনো পরিপূর্ণতা আসবে না। আপনি বাকিতে পণ্য কেনেন বা কাস্টমারের সঙ্গে বাকিতে লেনদেন করেন, সব ধরনের বাকি-বকেয়ার নির্ভুল হিসাব রাখতে হবে। যদি বকেয়া-বাকির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন তা হলে আরও ভালো। এটা আপনার ব্যবসার হিসাবকে সহজ করবে।
সব লেনদেনের ইনভয়েস প্রদানের অভ্যাস করুন
সব লেনদেনের ইনভয়েস প্রদান করার অভ্যাস আপনাকে রাতারাতি পেশাদার একটি ইমেজ এনে দেয়। এতে ব্যবসার বকেয়া-বাকিও কমতে শুরু করে। তাই এমন অ্যাপে ব্যবসার হিসাব রাখুন, যেখানে সহজেই ইনভয়েস বা বিল জেনারেট করা যায় এবং সেটা প্রিন্ট দেওয়া ও শেয়ার করা যায়। বিল বা চালান একটি পেশাদার ডকুমেন্ট। এটি যেকোনো লেনদেনকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। এ ছাড়া ইনভয়েস আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। যা পরবর্তী সময়ে ব্যবসার আয়-ব্যয়ের হিসাব করতেও কাজে লাগে।
প্রতিদিন ব্যবসার আয়-ব্যয়ের হিসাব করুন
মাসে বা সপ্তাহে নয়, প্রতিদিন ব্যবসার হিসাব করার অভ্যাস করুন। ব্যবসার আয়-ব্যয়ের হিসাব সঠিকভাবে রেকর্ড রাখতে এর কোনো বিকল্প নেই। তাই আপনার দরকার এমন একটি অ্যাপ, যেটা আপনার হিসাব রাখার কাজকে সহজ করে।
ব্যবসার আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখুন ডিজিটালি
ব্যবসার হিসাব তো সবাই রাখে। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে ব্যবসার আয়-ব্যয়ের হিসাব আপনি কোথায় রাখছেন? টালি খাতায় বা ডায়েরিতে লিখে ব্যবসার হিসাব রাখার যে প্রথাগত পদ্ধতি, সেটাকে বিদায় জানাতে হবে সবার আগে। কারণ, আধুনিক ব্যবসার নির্ভুল হিসাব আপনি চাইলেও প্রথাগত পদ্ধতিতে রাখতে পারবেন না। হ্যাঁ, অনেকে ল্যাপটপ বা কমপিউটারে কিংবা ক্লাউডভিত্তিক স্প্রেডশিটেও ব্যবসার হিসাব রাখছেন। তবে এগুলোর কোনোটাই এখন আর বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। কারণ-
-বেশির ভাগ ব্যবসা এখন অনলাইন বা ই-কমার্স ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ফলে ব্যবসার আয়-ব্যয়ের হিসাবে যুক্ত হয়েছে ডেলিভারি চার্জ, বিভিন্ন পেমেন্ট মাধ্যম, ২৪ ঘণ্টা অর্ডার, অনলাইন পেমেন্ট, বিভিন্ন অফার, ক্যাশব্যাক অফার, মূল্যছাড় ইত্যাদি নতুন নতুন ধারণা। সাধারণভাবেই ব্যবসার হিসাব রাখা এখন আগের মতো সরল-সোজা নেই।
-যেকোনো ব্যবসার জন্য ভ্যাট, ট্যাক্সসহ সরকারি নানা ফি যুক্ত হয়েছে। এমনকি প্রতিটি লেনদেনেই আছে এসব প্রদান করার জটিলতা।
-বিশ্বায়নের এই যুগে ব্যবসা এখন অনেক গতিশীল। ফলে আপনার ব্যবসার হিসাব বাসায় গিয়ে টেবিলে বসে চা-পান করতে করতে করবেন, সেদিন আর নেই। এখন -যেকোনো জায়গা থেকে হিসাব করার প্রয়োজন পড়ে। তাই ব্যবসার আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখতে হবে ডিজিটালি। কারণ, এটাই সহজ সমাধান এবং এটাই ভবিষ্যৎ!
সঠিক অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যার বাছাই করুন
ব্যবসার আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখতে সঠিক অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যার বাছাই করতে হবে। আপনার ব্যবসার জন্য বিশেষায়িত একটি সহজ ও সাশ্রয়ী অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যার বা অ্যাপে ব্যবসার হিসাব রাখা শুরু করুন। তার আগে জেনে নিন, ব্যবহারগত দিকে থেকে কী কী বিষয় বিবেচনা করে অ্যাকাউন্টিং অ্যাপ নির্বাচন করবেন:
-অ্যাপটির ইন্টারফেস ও ব্যবহারবিধি যেন সহজ ও সাবলীল হয়। যাতে অ্যাপের ব্যবহার বুঝতে আলাদা ট্রেনিংয়ের প্রয়োজন না হয়। তা ছাড়া কঠিন ব্যবহারবিধি আপনার হিসাবরক্ষণকে ক্লান্তিকর করতে পারে।অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যারটি মোবাইল ও ওয়েব দুটো ভার্সনেই পাওয়া যায়।
-মোবাইল অ্যাপেই ব্যবসার আয়-ব্যয়ের হিসাবসহ সব হিসাব করা যায়।
-ব্যবসার সব তথ্য যেন নিরাপদ থাকে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। তাই ক্লাউডভিত্তিক অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যার হওয়া জরুরি।
-বাংলাদেশের সাধারণ ব্যবসায়ীরা যেহেতু বাংলা ভাষায় অভ্যস্ত, তাই অ্যাপটিতে যেন সহজ বাংলা এবং ইংরেজি অপশন থাকে।
-অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যারটির খরচ আপনার হাতের নাগালে কি না।
তারেক