লেবাননের সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার মন্ত্রিসভা। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাতে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গতকাল মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার এক জরুরি বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
যুদ্ধবিরতি চুক্তি বুধবার (২৭ নভেম্বর) স্থানীয় সময় ভোর ৪টা থেকে (বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টা) কার্যকর হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের মধ্যস্থতায় এই চুক্তি সম্ভব হয়েছে বলে মঙ্গলবার (২৬ নভেম্বর) জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।
এই যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে হিজবুল্লাহর মতো ‘জঙ্গি সংগঠনগুলো’ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ করতে বাধ্য হবে, বলেন তিনি। ‘ধীরে ধীরে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী অঞ্চলটি থেকে সরে যাবে। লেবাননের সেনাবাহিনী এই এলাকায় উপস্থিত থেকে হিজবুল্লাহর অতৎপরতা বন্ধ করতে সহায়তা করবে।’
এ বিষয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে লেবাননের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদাল্লাহ হাবিব জানান, ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী সরে গেলেই পাঁচ হাজার লেবানিজ সৈন্য অঞ্চলটিতে অবস্থান নেবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের চাপের মুখে হিজবুল্লাহযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় নেতানিয়াহু সরকার। জেরুজালেম, ওয়াশিংটন ও বৈরুতের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে একাধিক ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে আরও আলোচনা করতে হবে। তবে তেলআবিব নতুন এই যুদ্ধবিরতির প্রধান প্রধান বিষয়ে অনুমোদন দিয়েছে।
ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা মুখপাত্র জন কিরবি বলেছেন, ‘চুক্তির বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। তবে সবকিছু চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো কিছু হয়েছে, সেটা বলা যাবে না।’
ফরাসি প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার যুদ্ধবিরতি আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
এ ছাড়া লেবানন সরকার ও হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিও তারা গ্রহণ করেছে। বিশেষ মার্কিন দূত আমোচ হোচেস্টেইন গত সপ্তাহে জেরুজালেম ও লেবানন সফর করে সব পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
সম্ভাব্য মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে যাবে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ। এটাকে পরীক্ষামূলক চুক্তি হিসেবে দেখা হবে। এর পর পরিস্থিতি পর্যালোচনা শেষে যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হতে পারে।
তবে এই চুক্তির বিরোধিতা করবেন বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার উগ্র ডানপন্থি নেতা ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গাভীর। এই চুক্তিকে ‘বড় ভুল’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ‘এর মধ্য দিয়ে হিজবুল্লাহকে নিশ্চিহ্ন করার ঐতিহাসিক সুযোগ নস্যাৎ করা হবে।’
তবে যুদ্ধবিরতি আলোচনার মাঝে লেবাননে হামলা অনেক তীব্রতর করেছে ইসরায়েলি বর্বর বাহিনী। বৈরুত থেকে আল-জাজিরার প্রতিবেদক জেইন বাসরাভি বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে লেবাননে ইসরায়েলি হামলাগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী, আরও ধ্বংসাত্মক, অনেক ঘন ঘন এবং কোনো পূর্ব সংকেত ছাড়াই সংঘটিত করা হচ্ছে। এখানকার মানুষ ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন থেকে পালিয়ে বাঁচার কোনো সুযোগই পাচ্ছে না।’
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইয়েডিয়থ আহরনোথ জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত হিজবুল্লাহর হামলায় উত্তর ইসরায়েলের কমপক্ষে ৮ হাজার আবাসিক বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৭ হাজার গাড়ি এবং ৩শ কৃষি প্রকল্প ধ্বংস হয়েছে বলে এক জরিপ শেষে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
এদিকে গত সোমবার (২৫ নভেম্বর) ইসরায়েলের হামলায় লেবাননে আরও ৩১ জন নিহত হয়েছেন। একই দিন গাজায় প্রাণ হারিয়েছেন আরও ১১ জন। দখলদার বাহিনীর এই হামলায় গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত দুই অঞ্চল মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা ৪৮ হাজার ছাড়িয়েছে।
এ ছাড়া মঙ্গলবারের (২৬ নভেম্বর) ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে ১৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন বলে দাবি করছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
ফিলিস্তিনে জাতিসংঘের ত্রাণ বিতরণ সংস্থার গুদামে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এই ঘটনায় একজন স্বেচ্ছাসেবক মারা গেছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন।
এদিকে ফিলিস্তিনের রাফাহ অঞ্চলের বেশ কিছু বাসিন্দা গাজা উপত্যকায় সরে যেতে বাধ্য করা হিবে বলে জানান ইসরায়েল সেনাবাহিনীর মুখ্যপাত্র দানিয়েল হ্যাগারি। সূত্র: আল-জাজিরা
নাইমুর/অমিয়/