যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপে বাংলাদেশের ভয়ের কোনো কারণ নেই। দেশটির সঙ্গে জোরালোভাবে আলোচনা করা হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি নিজেই সরাসরি এ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।
শনিবার (৫ এপ্রিল) যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা শুল্ক ইস্যুতে আয়োজিত এক জরুরি বৈঠকে এসব আলোচনা হয়েছে। জরুরি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন, প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, বিডার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্যসচিব সিরাজ উদ্দিন মিয়া, প্রধান উপদেষ্টার এসডিজি-বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ, অর্থসচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান এবং বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) চেয়ারম্যান জাইদী সাত্তার।
বৈঠক শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা শুল্ক ইস্যুতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই দেশটির প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করবেন। বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, বাণিজ্য ঘাটতিকে বিবেচনা করেই যুক্তরাষ্ট্র এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমদানি বৃদ্ধির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সেই বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর প্রচেষ্টা করা হবে। এর অংশ হিসেবে সয়াবিন তেল ও তুলার মতো প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি আরও কিছুটা বাড়াতে চায় সরকার। সেই সঙ্গে এতে আমাদের নতুন সম্ভাবনাও দেখতে পাচ্ছি। প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমরা ভালো অবস্থানে রয়েছি। বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে সেই সম্ভাবনাকেই কাজে লাগানোর চেষ্টা করব।’
প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এতে ভয় পাওয়ার বা আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আমরা এই বিষয়ে সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা হয় তুলা, গম, সয়াবিন, স্ক্র্যাপসহ ১৯০টি পণ্যের ওপরে শূন্য শুল্ক আরোপ আছে। যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যেসব পণ্য আমদানি করা হয় তার গড় শুল্ক মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশ। বৈঠক সূত্রমতে, বাংলাদেশের ভয়ের কিছু নেই। ট্রাম্পের বাড়তি শুল্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন দুয়ার উন্মোচিত হলো।
এই প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান খবরের কাগজকে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কের বিষয়টি জোরালোভাবে আলোচনা করবেন। তিনি বলেন, দেশের জন্য যা মঙ্গল হয় সরকার সেটাই করবে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার খুবই ব্যবসাবান্ধব। আমরা এমন কিছু করব, যার ফলে বাংলাদেশের যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি আরও বাড়বে, কমবে না। এ সিদ্ধান্ত আসবেই, সেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আমাদের খুবই ভালো বন্ধু। তারা যেসব ইস্যু তুলেছে তার সব নিয়ে আজকে আলাপ হয়েছে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশে আরও বাড়বে, কমবে না।’
শফিকুল আলম আরও বলেন, ব্যবসায়ীদের মতামতকে খুবই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ তারাই রপ্তানি করে, সরকার করে না। তাদের প্রস্তাবের বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে পদক্ষেপ নেওয়া হবে, যেটা খুবই ব্যবসাবান্ধব হবে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বা পাল্টা শুল্ক নীতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে আমদানীকৃত পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ঘোষণার সময়, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ব্যাংককে বঙ্গোপসাগরীয় দেশগুলোর আঞ্চলিক সহযোগিতা জোটের (বিমসটেক) শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিচ্ছিলেন। ট্রাম্পের এই শুল্কারোপে হুমকির মুখে পড়েছে দেশের পোশাক শিল্প খাত। তাই দেশে ফিরেই প্রধান উপদেষ্টা এ বিষয়ে জরুরি বৈঠকের ডাক দিলেন। জানা গেছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস আশা প্রকাশ করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক ইস্যু সমাধানে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতির প্রভাব মোকাবিলায় আমদানি নীতিতেও কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বৈঠকে সেসব বিষয়েও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
শুল্ক নিয়ে জরুরি আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক রবিবার
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ নিয়ে করণীয় ঠিক করতে রবিবার (৬ এপ্রিল) জরুরি আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক ডেকেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বেলা ৩টায় অর্থ উপদেষ্টার সভাপতিত্বে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। এ বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য হলো পাল্টা শুল্ক আরোপের বিষয়টি পর্যালোচনা করার পাশাপাশি পরবর্তী কৌশল ঠিক করা। এ ছাড়া বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানের সভাপতিত্বে সকাল ১০টায় আরও একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানেও করণীয় নির্ধারণে আলোচনা হবে। এ বৈঠক সশরীরে অনুষ্ঠিত হবে না। জুম লিংকের মাধ্যমে ভার্চ্যুয়ালি এ বৈঠকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কর্মকর্তারা অংশ নেবেন।
ঈদের ছুটির মধ্যেও গত শুক্রবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে বৈঠকে অংশ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। যাদের বৈঠকে অংশ নিতে অনুরোধ করে চিঠি দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন পররাষ্ট্রসচিব, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কমার্শিয়াল কাউন্সিলর, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক।
এর আগে, গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বিকেল ৪টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ২টা) হোয়াইট হাউসে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ হারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের পণ্যে এমন শুল্ক আরোপ করেন তিনি। যে দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি বেশি, সেই দেশের ওপর বেশি হারে শুল্ক আরোপ হয়েছে। এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় চলছে। বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো যে দেশে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য যায়, সে দেশে উচ্চ শুল্ক হারসহ বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্য বাধা আছে।
অর্থনীতিবিদ, রপ্তানিকারক ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। এখন ১৫ শতাংশ শুল্ক দিয়ে বাংলাদেশে তৈরি পোশাকপণ্য রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রে। ট্রাম্প সরকারের সিদ্ধান্তের ফলে এখন বাড়তি শুল্ক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করতে হবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি কমে যাবে। বন্ধ হবে অনেক কারখানা। বেকার হবেন শ্রমিক। সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি পর্যালোচনা করে জরুরি ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার তাগিদ দিয়েছেন সরকারকে।
বাংলাদেশের প্রধান দুই রপ্তানি বাজারের একটি যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের একটি বড় অংশ রপ্তানি হয় দেশটিতে। যুক্তরাষ্ট্রে বছরে বাংলাদেশের রপ্তানি হয় প্রায় ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন (৮৪০ কোটি) ডলারের পণ্য, যা প্রধানত তৈরি পোশাক। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানি দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন (৭৩৪ কোটি) ডলারে। অন্যদিকে বাংলাদেশ আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বছরে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। ফলে দুই দেশের মধ্যে বাংলাদেশের বাণিজ্য অনুকূলে। নতুন করে উচ্চমাত্রায় এই শুল্ক আরোপে বাংলাদেশের রপ্তানি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন রপ্তানিকারকসহ সংশ্লিষ্টরা।