শেষ হচ্ছে ২০২৩ সাল। দুয়ারে কড়া নাড়ছে নতুন বছর। পুরাতনের বিদায় আর নতুনের বরণে প্রস্তুত পুরো বিশ্ব। তরুণ প্রজন্মের তো ব্যস্ততার শেষ নেই। কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছি, একটি বছরের শেষ হওয়া মানে কী? একটি বছর তো শেষ হয়ে গেল, কিন্তু যে কাজের জন্য আল্লাহতায়ালা পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, তার কতটুকু করতে পেরেছি? মুমিন উদ্দেশ্যহীন জীবনযাপন করে না। গড্ডলিকার প্রবাহে গা ভাষায় না। বরং মুমিনের সব সময় এই চিন্তায় বিভোর থাকা উচিত যে, কীসের জন্য এই পৃথিবীতে আমার আগমন? আর আমি কী করছি? মৃত্যুর মাধ্যমে যখন এই জীবনের সমাপ্তি ঘটবে, তখন এই পৃথিবী থেকে কী নিয়ে যাব? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বুদ্ধিমান তো সে, যে নিজের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য কর্ম করে। আর অক্ষম সে, যে প্রবৃত্তির অনুসারী হয় আর আল্লাহর প্রতি অলীক প্রত্যাশা পোষণ করে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৪৫৯)
নতুন বছরের পরিকল্পনায় করণীয়—
তওবা করা: তওবা এমনই এক পরশ পাথর, যার মাধ্যমে পাপী বান্দাও নিষ্পাপ হয়ে যান। আল্লাহ তওবাকারীকে ভালোবাসেন। তাই নতুন বছরের সূচনায় বেশি বেশি তওবা করব। অতীতের ভুলভ্রান্তি থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইব। একইভাবে সামনের দিনগুলোয় যেন পেছনের ভুলভ্রান্তি, পাপের পুনরাবৃত্তি না হয় সে শপথ গ্রহণ করব।
মুমিনের কাছে সময়ের গুরুত্ব অনেক। তাই আগত বছরের একটি মুহূর্তও যেন অপচয় না হয় সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। প্রয়োজনে একটি রুটিন করে নিতে হবে। আর এই প্রত্যয় থাকতে হবে যে, এ বছর গত বছরের চেয়ে বেশি তওবা, ইস্তিগফার, জিকির, কোরআন তেলাওয়াত, দান-সদকা করব।
কখনোই মিথ্যা বলব না: মিথ্যা বলা খুবই বাজে অভ্যাস। একটি মিথ্যাকে ঢাকতে আরও অনেকগুলো মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। এ জন্যই মিথ্যাকে পাপের জননী বলা হয়ে থাকে। মিথ্যা মানুষকে লজ্জিত করে। মিথ্যা মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। মিথ্যার চেয়ে নিকৃষ্ট গুনাহ নেই। হাদিসে এসেছে, ‘মানুষ যখন মিথ্যা কথা বলে, তখন মিথ্যার দুর্গন্ধে ফেরেশতারা মিথ্যাবাদীর থেকে এক মাইল দূরে চলে যায়।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১৯৭২)
অন্যায় থেকে দূরে থাকা: বিগত বছরে যেসব অন্যায় কাজ করেছি, এ বছর এসব থেকে দূরে থাকার প্রতিশ্রুতি করা। নিজের অজান্তেও কোনো অন্যায়ে না জড়ানো। বরং কেউ অন্যায় করলে তার প্রতিবাদ করা। তাকে বোঝানো, এটা অন্যায়। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত; যাদের মানুষের (কল্যাণের) জন্য বের করা হয়েছে। তোমরা ভালো কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজে বারণ করবে...।’ (সুরা আল ইমরান, আয়াত: ১১০)
‘থার্টিফার্স্ট নাইট’ বা ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ উদযাপনের নামে কোনো ধরনের অপসংস্কৃতি, অশ্লীলতায় জড়ানো যাবে না। একজন মুমিন হিসেবে সব ধরনের পাপ বর্জন করতে হবে। যেমন—
গান বাজনা: নতুন বছরের আগমনকে কেন্দ্র করে অনেকেই গান বাজনার আয়োজন করে—যা মারাত্মক গুনাহর কাজ। আল্লাহতায়ালা ও রাসুলুল্লাহ (সা.) এসব নিন্দনীয় কাজকে সম্পূর্ণ হারাম ও অবৈধ বলে ঘোষণা করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, ‘এক শ্রেণির লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে পথভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যে অবান্তর কথাবার্তা সংগ্রহ করে অন্ধভাবে এবং এটাকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে। এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।’ (সুরা লুকমান, আয়াত: ৬)
আতশবাজি ও পটকাবাজি: ‘নিউ ইয়ার’ উৎসবে অনেকেই আতশবাজি পোড়ায়। এটি খুবই ভয়ানক একটি কাজ। এতে জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক ও ভীতি সৃষ্টি হয়। এর দ্বারা অগ্নিসংযোগেরও আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া এসব কর্মকাণ্ডে জনসাধারণকে নিদারুণ কষ্ট ভোগ করতে হয়। আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ মুমিন নারীদের কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ৫৮)
অর্থের অপচয়: এ রাতকে কেন্দ্র করে অনেক অর্থের অপচয় হয়। আর ইসলাম অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই বলে আখ্যায়িত করেছে। এ ব্যাপারে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় অপচয়কারী শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের বড়ই অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৭)
এ ছাড়া নতুন বছর বরণের যত অনৈসলামিক কার্যকলাপ হয়, সেগুলো থেকে বিরত থাকতে হবে।
লেখক: খতিব, কসবা জামে মসজিদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া